খুলনা-চালনা মহাসড়কের পাশেই বটিয়াঘাটা উপজেলার গুপ্তমারী গ্রামের লতা রায়ের ছোট দোকানটি এখন তাঁর জীবনের সচ্ছলতার ঠিকানা হয়ে উঠেছে। প্রায় তিন বছর ধরে এই দোকানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি নিজের ও প্রতিবেশীদের উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করছেন। দোকানের সামনে সাজানো থাকে কুমড়ার ফুল, শসা, বরবটি, উচ্ছে, লেবু, ডুমুর, পাকা ও কাঁচা পেঁপে, ঘাটকোল, কচু, কুমড়া, হেলেঞ্চা, মালঞ্চ ও তেলাকুচা শাক, কলমিডাঁটা। এছাড়া মুরগির ডিম, পাকা তেঁতুল, পাকা তালের ক্বাথ ও তালও এখানে পাওয়া যায়। এসব পণ্য দেখে মনে হয়, যেন কিছুক্ষণ আগেই খেত থেকে তুলে আনা হয়েছে। বেশির ভাগই তাঁদের নিজেদের চাষের ফসল।

লতা রায়ের বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটি মাছের ঘের রয়েছে। ঘেরের পাড়ে তিনি, তাঁর স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে সবজি চাষ করেন। প্রতিদিন ভোর চারটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না শেষ করে দিনের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি তোলেন। এরপর সেগুলো বাছাই ও গুছিয়ে বেলা এগারোটার দিকে দোকানে নিয়ে আসেন। দোকান সাজানোর ফাঁকেই শুরু হয় বেচাকেনা। সম্প্রতি এক শুক্রবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে দোকানে বসে তিনি একটি পাকা পেঁপে ওজন করে কলম দিয়ে তার গায়ে ওজন লিখে রাখছিলেন। এরপর বিক্রি হওয়া পণ্যের বিবরণ খাতায় টুকে রাখেন।

এই দোকান শুধু লতার নিজের ফসল বিক্রির স্থান নয়। রায়বাড়ির আরও চার শরিকের কাছ থেকেও নানা পণ্য আসে। কেউ সবজি দেন, কেউ অন্য পণ্য। লতা সবকিছুর হিসাব খাতায় লিখে রাখেন। কোনো পণ্য বিক্রি না হলে তা ফেরত দেন। আর বিক্রি হওয়া পণ্যের টাকা থেকে সামান্য অংশ রেখে সন্ধ্যায় শরিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেন। এই হিসাব-নিকাশের কাজে তাঁর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা বেশ কাজে লাগে। তিনি বলেন, কে কতটুকু সবজি নিলেন, কত টাকা হলো, শরিকদের কাছ থেকে কী পণ্য এল—সবই তিনি লিখে রাখেন।

লতার জন্ম ডুমুরিয়ার বিল পাবলা গ্রামে। চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তাঁর স্বামী পরিতোষ রায় দরজির কাজ করেন। দুই সন্তানের মধ্যে একজন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, অন্যজন উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করছেন। রাস্তার পাশে বসে সবজি বিক্রির পরিকল্পনা তাঁর আগে থেকে ছিল না। এক বছর তিনি বাঙ্গি চাষ করেছিলেন। কিন্তু সেবছর বাজারে দাম এত কম ছিল যে, খেত থেকে বাঙ্গি তুলে বাজারে নিয়ে গেলে গাড়িভাড়াই উঠত না। একসময় খেত ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। পরে কিছু বাঙ্গি তুলে রাস্তার পাশে বসে বিক্রির চেষ্টা করেন। পথচলতি মানুষের আগ্রহ দেখে বুঝতে পারেন, বাড়ির ফসল বিক্রি করতে সবসময় হাটে যেতে হয় না। এরপর থেকে বাড়িতে উৎপাদিত সবজি রাস্তার পাশে এনে বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়তে থাকে। একসময় কয়েকটি টিন দিয়ে ছোট একটি চালা তৈরি করেন, যা আজ তাঁর দোকান।

দোকানের ক্রেতাদের বেশির ভাগই শহরের মানুষ। খুলনা নগরের ইকবালনগর এলাকার বাসিন্দা অলোক বৈদ্য এই দোকান থেকে কুমড়ার ফুল কিনছিলেন। তিনি বলেন, সবসময় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয় না। তাই এমন জায়গা থেকে গ্রামের টাটকা সবজি কিনতে ভালো লাগে। লতা জানান, ক্রেতারা তরতাজা জিনিস পছন্দ করেন। অনেকেই ডুমুর, ঘাটকোলের মতো সবজি কীভাবে রান্না করতে হয়, জানেন না। তাই তিনি জেনে নিয়ে তাঁদের বুঝিয়ে দেন। কথা বলার ফাঁকে এক তরুণ-তরুণী মোটরসাইকেলে এসে পাকা তালের ক্বাথ খুঁজছিলেন। দোকানে তাল থাকলেও ক্বাথ ছিল বাড়ির হিমাগারে। লতা তাঁদের বাড়ি থেকে তা এনে দিলেন। চালের গুঁড়া দিয়ে তালের বড়া কীভাবে বানাতে হয়, সেটিও বুঝিয়ে দিলেন।

বেচাকেনায় দিনে কত টাকা হয়, জানতে চাইলে লতা খুব একটা বলতে চান না। একটু হেসে জানান, কখনো পাঁচশ টাকা হয়, আবার বেশিও হয়। তবে যা-ই হোক, আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। হাতে নগদ টাকা আছে, খরচ করার স্বাধীনতাও এসেছে। নিজেদের চাষ করেন, নিজেই বিক্রি করেন। শরিকদের কিছু টাকা দিতে পারছেন, তাঁদের প্রশংসা পাচ্ছেন—এটাও ভালো লাগে। আশপাশের বাজারের দর অনুযায়ী তিনি পণ্যের দাম রাখেন। বাড়ির উৎপাদিত পণ্যের দামে কিছুটা কমবেশি হলেও তাতে কোনো সমস্যা নেই।

লতার কাকিশাশুড়ি মিনতি রায় দোকানে এক ঝাঁকা মরিচ ও বরবটি নিয়ে এলেন। সেগুলো লতার দোকানে দিয়ে গেলেন। মিনতি জানান, বউমা তাঁদের পরিবারের জন্য লক্ষ্মীর ঘটের মতো। তাঁর উদ্যোগের ফলে পরিবারের আয়ের পথ খুলেছে এবং এখন আগের তুলনায় বেশি সবজি চাষ করা হচ্ছে। লতার উদ্যোগ দেখে একই এলাকায় আশপাশের আরও দু-তিনজন নারীও রাস্তার পাশে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি শুরু করেছেন। মহাসড়ক দিয়ে গাড়ি ছুটে যায়। এর ফাঁকে ফাঁকে কেউ থামেন, কুমড়ার ফুল নেন; কেউ নেন কচি শসা, কেউ অচেনা কোনো শাক। মহাসড়ক দিয়ে ফেরা মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের খেতের টাটকা সবজি।