বেসরকারি চাকরিজীবী শাহীন হোসেন গত জুনে একটি মুঠোফোন অ্যাপের মাধ্যমে তিন ধাপে মাত্র ৬ হাজার টাকা ঋণ নেন। মাসখানেকের মেয়াদে সেই ঋণের বিপরীতে তাঁকে পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা — যা হিসাব করলে দাঁড়ায় ৮০০ শতাংশেরও বেশি সুদ। ঋণের টাকার বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় প্রথমে তিনি তা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানান। এরপরই তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে হুমকি আসে — ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হবে, আত্মীয়স্বজনের নম্বরে হয়রানিমূলক ফোন করা হবে। শাহীন জানান, প্রতিদিন সুদের হার বাড়তে থাকে এবং হুমকিও তীব্র হতে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি পুরো টাকা পরিশোধ করে দেন এবং সিদ্ধান্ত নেন — আর কখনো এভাবে ঋণ নেবেন না।
যে অ্যাপের মাধ্যমে শাহীন ঋণ নিয়েছিলেন, তার নাম ফিনক্যাশ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ঋণদানকারী এমন অন্তত ৩০টি অ্যাপ রয়েছে, যেগুলোর কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব অ্যাপের নিয়ন্ত্রকেরা ব্যবহারকারীদের প্রলুব্ধ করে। কেউ ঋণ নিতে অ্যাপ ডাউনলোড করলে অজান্তেই তাঁর ফোন থেকে ছবি, ভিডিও, কন্টাক্ট তালিকা ও খুদে বার্তাসহ সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে ঋণের বিপরীতে অসম্ভব উচ্চ সুদ দাবি করা হয়, আর পরিশোধে ব্যর্থ হলে শুরু হয় নানা ধরনের হয়রানি।
বাংলাদেশে এ প্রবণতা নতুন এবং এখনো তেমন বিস্তৃত নয়। তবে ভারত ও পাকিস্তানে এই সমস্যা ভয়ংকর আকার নিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্ধ্র প্রদেশের ২৫ বছর বয়সী নরেন্দ্র নামে এক তরুণ বিয়ের পর একটি অ্যাপ থেকে দুই হাজার রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় তিনি তা না দেওয়ায় শুরু হয় হয়রানি। একপর্যায়ে তাঁর নববধূর বিকৃত ছবি পাঠিয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অবশেষে এই হয়রানির শিকার হয়ে নরেন্দ্র আত্মহত্যা করেন। এ ধরনের ঘটনা ভারতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপের কয়েকটি নজিরের মধ্যে একটি মাত্র।
ফেসবুক ও গুগল প্লে স্টোর ঘেঁটে বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম চালানো এসব অ্যাপের মধ্যে রয়েছে — সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, টাকা ক্যাশ লোন, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী ও লোনহাট। অনেক ক্ষেত্রে কৌশলে সুপরিচিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের নামও ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘সাথী লোন’ নামের অ্যাপটি ব্যক্তিপর্যায়ে বছরে ১৮ থেকে ২৬ শতাংশ সুদে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব দিচ্ছে, যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্লে স্টোরে আসার পর এক লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে। অন্যদিকে ‘কুইক লোন’ নামের আরেকটি অ্যাপ ১৮ শতাংশ সুদে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব করছে, যেটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে আসার পর পাঁচ লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সাঈদ মিয়া গত ঈদুল আজহার আগে ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে হঠাৎই অর্থের প্রয়োজনে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে একটি অ্যাপে ঋণের আবেদন করেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, মোট ২৪ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। মাত্র এক সপ্তাহ পরই অ্যাপে সুদসহ তাঁর বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা। ভয়ে তিনি ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। বাকি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর পরিচিতজনদের ফোন করা হবে এবং ভয়ভীতি দেখানো হবে — এমন হুমকি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ঋণের আবেদনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি এবং বিকাশ, নগদসহ মুঠোফোনে আর্থিক সেবার নম্বর চাওয়া হয়। টাকা সরাসরি সেই নম্বরে জমা হয়। অ্যাপ ইনস্টলের সময় ফোনবুক, ছবি, খুদে বার্তা ও অবস্থানের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য করা হয়; না দিলে আবেদনই সম্পন্ন হয় না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব অ্যাপের পরিচালনাকারীদের কোনো অফিস বা ঠিকানা নেই। কারা, কোথা থেকে এগুলো পরিচালনা করছে — তার কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে ঋণের এসব অ্যাপের ব্যবহার কতটা বাড়ছে, তার ধারণা পাওয়া যায় ওয়েবসাইট ট্রাফিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিমিলারওয়েবের তথ্যে। বাংলাদেশে জনপ্রিয় অর্থবিষয়ক অ্যাপের তালিকায় বিটকয়েন, অনলাইন ট্রেডিং ও ঋণসংক্রান্ত অ্যাপগুলো স্থান করে নিয়েছে। প্রথম আলো পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে; তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন পুলিশের একটি সংস্থার ই-মেইলে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, তাদের কাছে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই।
এদিকে মার্কিন বিচার বিভাগ গত এপ্রিলে এক বিবৃতিতে জানায়, কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে এসব অনলাইন প্রতারক চক্রের প্রধান আখড়া রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৩ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে এসব চক্রের চুরি করা অর্থের বার্ষিক পরিমাণ রক্ষণশীল হিসাবেও প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। ভারত সরকার সম্প্রতি এসব অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে; গত জুন পর্যন্ত দেশটি ৩ হাজার ৭১৮টি অ্যাপ বন্ধ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপে অবৈধ ঋণদানের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে ডিজিটাল ঋণের অ্যাপের প্রতারণা থেকে মানুষকে সচেতন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবে বলে তিনি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, ধরন বদল করে এসব অপরাধ চলছেই। এর জন্য গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারাটাও সমানভাবে দায়ী। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতারণা ভয়ংকর পর্যায়ে যাওয়ার আগেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি; নাহলে বহু মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকট।




