দেশে নাগরিকদের স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা ক্রমশ বাড়লেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জবাবদিহি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো নজির নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, কল রেকর্ড, ব্যাংক হিসাবসহ নাগরিকদের বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়েছে গত তিন বছরে। তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) ‘ব্রিচড অ্যান্ড আনআনসার্ড: বাংলাদেশ’স ডেটা ব্রিচ এপিডেমিক (২০২৩–২০২৬)’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৭টি, ২০২৪ সালে ২৭টি এবং ২০২৫ সালে ১৪টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি-মে) ২০টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সরকারি ও ৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সরকারি সেবা ও ইউটিলিটি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই খাতে ২০টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এরপরই রয়েছে বেসরকারি কোম্পানি ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যেখানে ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট ৫টি, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবাদাতা ৫টি, সশস্ত্র বাহিনীতে ৩টি এবং বেসরকারি ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা ৩টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

টিজিআইয়ের বাংলাদেশপ্রধান ফৌজিয়া আফরোজ উল্লেখ করেছেন, নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান কাঠামো, আইন ও জবাবদিহিতে স্পষ্ট ঘাটতি থাকায় তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনটি প্রস্তুতের সময় গবেষকেরা একটি সরকারি পোর্টালে এমন দুর্বলতা খুঁজে পান যেখানে প্রশাসনিক পাসওয়ার্ডসহ সংবেদনশীল তথ্য উন্মুক্ত ছিল। ওই দিনই বিষয়টি সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সরকারি সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টকে জানানো হয়।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, তথ্য ফাঁস শনাক্ত করার সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে খুবই সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাইরের সাইবার নিরাপত্তা গবেষক, ডার্ক ওয়েব মনিটরিং প্রতিষ্ঠান বা সংবাদমাধ্যমই প্রথম তথ্য ফাঁসের ঘটনা শনাক্ত করেছে। ২৪ ঘণ্টার সাইবার নিরাপত্তা তদারকি বা সক্রিয় হুমকি অনুসন্ধানের ব্যবস্থা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই, ফলে সিস্টেমে দুর্বলতা তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার সুযোগ থাকে না।

নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআইডি ডেটাবেজে সরাসরি অনুপ্রবেশের প্রমাণ না মিললেও তৃতীয় পক্ষের যাচাইব্যবস্থা ও প্রবেশাধিকারে নিরাপত্তাঘাটতি আছে। ২০২৪ সালে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠে পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যারা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে তথ্য পাওয়ার সুবিধা নিয়েছিলেন। প্রায় ৪২টি সরকারি সংস্থার ৫০০ কর্মকর্তা যাচাই ও তদন্তের প্রয়োজনে নাগরিকদের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পান, যা অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যভান্ডার-সংশ্লিষ্ট ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, ই-টিআইএন এবং আর্থিক নথি একসঙ্গে উন্মুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে তিনবার প্রবাসী শ্রমিকদের তথ্যভান্ডারে অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়েছে, যেখানে ১০ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিকের তথ্য রয়েছে।

তথ্য ফাঁসের পরও অর্থবহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই সীমিত বলে উল্লেখ করেছে টিজিআই। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ তথ্য ফাঁস হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্থার জন্য বিস্তৃত ছাড় এবং জবাবদিহির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির (এনসিএসএ) মহাপরিচালক মো. তৈয়বুর রহমান জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৬ হাজার ডোমেইন তারা তদারক করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডে (বিডিসিসিএল) হোস্টিংয়ের মাধ্যমে কয়েক স্তরের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কারিগরি জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, বিশ্বজুড়ে যেসব তথ্য পেতে মিলিয়ন ডলারের চেষ্টা চলে, সেসব তথ্য আমরা যেন স্বেচ্ছায় উন্মুক্ত করে রাখছি। তার মতে, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই; প্রয়োজন উপাত্ত সুরক্ষার আইনকানুন ও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত নিয়মগুলো প্রতিষ্ঠানগুলো পালন করছে কি না তা তদারক করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।