ঠাকুরগাঁও জেলায় ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর প্রধান কার্যালয়ের কয়েক একর জমিতে দুর্লভ প্রজাতির গাছের একটি উদ্যান গড়ে তোলার কাজ চলছিল। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই চারাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন রোপণের কাজে সেখানে গিয়েছেন লেখক। সেই সফরের অংশ হিসেবে আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহীর সঙ্গে গিয়ে সেখানে দেখা মেলে বিরল বন্যপ্রাণী খ্যাঁকশিয়ালের। তবে সেই অভিজ্ঞতার মাঝেও এক অভাবনীয় মুহূর্ত তৈরি হয় যখন লেখক ২০০ গজ দূরে একটি বড় প্রাণীর উপস্থিতি টের পান। সূর্যের বিপরীত দিকে থাকায় প্রথমে তাকে পাতিশিয়াল মনে হলেও, খুব দ্রুতই তা একটি বনবিড়াল হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বনবিড়ালটি পোষা বিড়ালের চেয়ে আকারে বেশ বড় এবং বন্য প্রকৃতির। মাটিতে বিশ্রাম নেওয়া এবং একা একা হাঁটার সময় লেখক তার বেশ কিছু ছবি তুলতে সক্ষম হন। এলাকাটি ছিল একটি নদীর পাড়, যেখানে জঙ্গল ও আখের খেতের সংমিশ্রণে এক নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছিল। এই বনবিড়ালের বৈজ্ঞানিক নাম Felis chaus এবং ইংরেজিতে একে 'জঙ্গল ক্যাট' বলা হয়। ধূসর-বাদামি গায়ের রং, পায়ে ও লেজে ডোরাকাটা দাগ এবং মুখে সাদা গোঁফ এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

স্মৃতিচারণ করে লেখক জানান, চার দশক আগেও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বনবিড়ালের দেখা মিলত। বাড়ির কবুতর, হাঁস-মুরগি এমনকি ছাগলের বাচ্চাও শিকার করত এই প্রাণী। অঞ্চলভেদে একে 'বাড়বিলাই' বা 'গাড়োয়া' নামে ডাকা হয়। প্রচলিত লোকবিশ্বাসে বনবিড়ালের ডাককে অনেকে অমঙ্গলের সংকেত মনে করেন, আবার কেউ বিশ্বাস করেন এর মাংস খেলে শরীরের বিষ-ব্যথা দূর হয়, যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোনো প্রমাণ নেই।

বর্তমান সময়ে বনবিড়াল অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণ হলো দ্রুত হারে বনজঙ্গল উজাড় হওয়া, যার ফলে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে গেছে এবং খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এই প্রাণীটিকে মেরে ফেলে। অথচ বনবিড়াল গাছে চড়তে এবং সাঁতার কাটতে পারে, কিন্তু মানুষের ওপর আক্রমণ করার কোনো রেকর্ড নেই। অভিজ্ঞ আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহী দীর্ঘ সময় ধরে পাখি ও সাপের ছবি তুললেও ওইদিন প্রথমবারের মতো বনবিড়ালের ছবি তুললেন, যা প্রাণীটির চরম স্বল্পতারই প্রমাণ দেয়। আগামী প্রজন্মের জন্য এই বন্যপ্রাণীকে প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বনবিড়ালের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।