আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজন’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) ও প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন, স্টার্ট বাংলাদেশ হাব ও ইডিএম-এর সহযোগিতায় এই আলোচনা সভাটি পরিচালিত হয়।

বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ নিজস্ব সক্ষমতায় ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে। তবে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছাতে দায়িত্বশীলদের আরও সচেতন হতে হবে। তিনি জানান, তিনটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা এখন দেশের ৬৪টি জেলায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের যুগ্মসচিব মো. রাসেল সাবরিন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের পরিবর্তিত রূপের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দেন পটুয়াখালীর চর হেয়ারের কথা, যেখানে আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় সিডর ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছিল। বর্তমানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় একটি বিশেষ প্রটোকল তৈরির কাজ চলছে, যা চলতি বছরেই সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সানজিদা ইয়াছমিন এবং ইএসডিও-র নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাদের মতে, দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেয়ে পূর্বাভাস ভিত্তিক দ্রুত সহায়তা প্রদান এবং বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি কার্যকর।

আলোচনায় ইএসডিও-র জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সৈয়দ আশরাফ উল ইসলাম ত্রাণ বিতরণের অসামঞ্জস্যতা দূর করতে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তারা করপোরেট খাতের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্যোগ মোকাবিলায় যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। স্টার্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার শফিউল আলম জানান, শুধু কম্বল বিতরণ নয়, দুর্যোগের সময় মানুষের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নগদ অর্থ সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর শামীম আহমেদ এবং প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আয়াতুল্লাহ আল-মামুন সরকারি নেতৃত্ব, স্থানীয় সংগঠনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত ভূমিকার কথা বলেন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, নগর ঝুঁকি এবং ভূমিকম্প সহনশীল নকশার গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন ইডিএম-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শামীমা আখতার এবং মনা আল আমিনে। তারা লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভবতী নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। এছাড়া ডিএমইআরটি-র প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল ইসলাম তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ‘তিস্তা বন্ড’-এর মাধ্যমে দেশীয় অর্থায়নের প্রস্তাব দেন।

বৈঠকের শেষে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নির্ভুল ডেটাবেস তৈরি, ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, উপজেলা পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতির বরাদ্দ বৃদ্ধি, করপোরেট খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী জীবিকা পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা।