যুক্তরাষ্ট্রের কালো ভালুকেরা (Ursus americanus) শীতকালে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে কাটায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় হাইবারনেশন বা শীতঘুম বলা হয়। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো, এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। তবে ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই আচরণটি আরও জটিল এবং এতে দিনের আলোর দৈর্ঘ্যের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভার্জিনিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অ্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ব্রোগান হলকম্ব-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্ল্যাক বিয়ার রিসার্চ সেন্টারে থাকা চারটি অন্তঃসত্ত্বা বন্য কালো ভালুকের ওপর নজরদারি চালানো হয়। গবেষক দল প্রায় ২২ হাজার ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভালুকদের ৪৫ ধরনের ভিন্ন আচরণ চিহ্নিত করেছেন। এই তথ্যগুলোকে তাপমাত্রার পরিবর্তন, দিনের আলোর স্থায়িত্ব এবং শীতঘুমের বিভিন্ন ধাপের শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। গবেষণার ফলাফলটি প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস সাময়িকিতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে, শীতঘুমের প্রতিটি পর্যায়ে পরিবেশের সংকেতগুলো ভিন্নভাবে কাজ করে। হাইবারনেশনের শুরুর দিকে মূলত তাপমাত্রা ভালুকের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে শীতঘুমের আগে যখন তারা প্রচুর খাবার খেয়ে শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে, তখন ভিন্ন প্রক্রিয়া কাজ করে। আবার শীতঘুম শেষ করে গুহা থেকে বেরিয়ে আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাপমাত্রা এবং দিনের দৈর্ঘ্য—উভয় সংকেত একসাথে কাজ করে ভালুকের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, বাইরের ঠান্ডা-গরমের পাশাপাশি দিনের আলো কতক্ষণ থাকছে, তা ভালুকের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি সংকেত।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই প্রাকৃতিক তালমিল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পৃথিবীর কক্ষপথ ও ঋতুর কারণে দিনের দৈর্ঘ্য একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবর্তিত হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রার স্বাভাবিক নিয়ম বদলে যাচ্ছে। এর ফলে দিনের আলো এবং তাপমাত্রার মধ্যকার সামঞ্জস্য নষ্ট হতে পারে, যা কালো ভালুকদের শীতঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে বাধাগ্রস্ত করবে।

যদি ভালুকেরা সময়ের আগে বা পরে শীতঘুমে যায় অথবা অসময়ে জেগে ওঠে, তবে তা পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে, অসময়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় জেগে উঠলে খাবারের খোঁজে ভালুকেরা মানুষের বসতি বা লোকালয়ে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সংকেতগুলোর মধ্যে কোনো বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।