শ্রেণিকক্ষে কিংবা টিফিনের বিরতিতে সহপাঠীদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই রয়েছে। তবে এই রীতির সূচনা কিন্তু বহু পুরোনো নয়। এক সময় স্কুলগুলোতে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত না। সকালে ক্লাস শুরু হয়ে বিকেলেই শেষ হতো। অধিকাংশ শিক্ষার্থী দুপুরের খাবারের জন্য বাড়ি ফিরে যেত, কারণ স্কুলগুলো ছিল বসতবাড়ির খুব কাছে। যাদের বাড়ি দূরে, তারা টিফিন বক্সে করে খাবার বহন করে আনত। তবে আবাসিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল—সবাই একসঙ্গে ডাইনিং হলে গিয়ে খেতে পারত।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ দানা বাঁধে। এই পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি দাতব্য সংস্থা এগিয়ে আসে এবং বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি কোনো সরকারি প্রকল্প ছিল না; বরং বিভিন্ন শহরে ছোট পরিসরে স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টা হিসেবে শুরু হয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ও বোস্টন শহরকে পথিকৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৯৪ সালে ফিলাডেলফিয়ার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার দেওয়া শুরু হয় মাত্র এক পেনির বিনিময়ে। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ আরও কিছু স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে। বোস্টনে একদল নারী সংগঠন কেন্দ্রীয় রান্নাঘরে খাবার প্রস্তুত করে বিভিন্ন স্কুলে পৌঁছে দিত। কয়েক বছর পর কয়েকটি স্কুলে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে গরম খাবার পরিবেশন করা শুরু হয়। সে সময় আলাদা কোনো খাবার ঘর বা ক্যান্টিন ছিল না; শিক্ষার্থীরা নিজেদের বেঞ্চেই বসে খাবার গ্রহণ করত।
গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। সেখানে রান্নাঘর বা ডাইনিং রুমের সুযোগ না থাকায় শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষ গরম রাখার চুলাতেই বড় হাঁড়িতে স্যুপ গরম করতেন। কিছু কিছু স্কুলে শিক্ষার্থীরা কাচের জারে ম্যাকারনি, স্যুপ বা কোকো নিয়ে এসে গরম পানিতে ডুবিয়ে রাখত। দুপুরের আগেই খাবার গরম হয়ে যেত—এই সহজ পদ্ধতিটি তখন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্যারেন্ট-টিচার অ্যাসোসিয়েশন (পিটিএ) এই উদ্যোগে যুক্ত হলে স্কুল লাঞ্চ কর্মসূচি ব্যাপক আকার ধারণ করে। সংগঠনটি অর্থ, রান্নার সরঞ্জাম ও ছোট চুলা কেনার জন্য সহায়তা প্রদান করত। তবে বড় বাধা ছিল আইনি স্বীকৃতির অভাব। সরকারি কোনো আইন না থাকায় অনেক স্কুল বোর্ড এই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিল না। রান্নাঘর ও খাবারঘর নির্মাণও বেশ ব্যয়বহুল ছিল।
অবশেষে ১৯৪৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস ‘ন্যাশনাল স্কুল লাঞ্চ অ্যাক্ট’ পাস করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান আইনে স্বাক্ষর করলে স্কুল লাঞ্চ কর্মসূচি সরকারি মর্যাদা পায়। এর ফলে দেশজুড়ে বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পরিবেশনের পথ উন্মুক্ত হয়।
এদিকে শিল্পায়নের ফলে মানুষ কাজের সন্ধানে দূরে সরে যেতে শুরু করলে দ্রুত খাবার পরিবেশনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন ক্যাফেটেরিয়া পদ্ধতির প্রচলন বাড়ে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ট্রে হাতে নিজের পছন্দের খাবার নেওয়ার এই ব্যবস্থা পরবর্তীকালে স্কুলগুলোতেও চালু হয়। এর ফলে অল্প সময়ে অনেক শিক্ষার্থীকে খাবার দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশেও সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে স্কুলে মিড ডে মিল চালু করা হয়েছে। এতে পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম ও কলার মতো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাসা থেকে নুডলস, কেক বা বিস্কুট নিয়ে আসে, আবার অনেকে দোকান থেকে কেনে। তবে যে খাবারই গ্রহণ করা হোক না কেন, পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করাই সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।



