মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক মনিটরিং প্রতিবেদনে শিক্ষা ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৫ হাজার ৪৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম মনিটরিং করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ১৯০টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হিসেবে দেখা গেছে।
শুধু উপকরণের সমস্যাই নয়, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি যাচাইয়ের ব্যবস্থায়ও বড় দুর্বলতা রয়েছে। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে।
শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকলেই শেখা নিশ্চিত হয় না। পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে উপকরণের কার্যকারিতা থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিখনফল অর্জনে শিখন উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষাক্রম অনুযায়ী কী ধরনের শিখন কার্যক্রম প্রত্যাশিত এবং সে অনুযায়ী উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, শিক্ষাক্রমের চাওয়া, শিখন উপকরণের নকশা ও পরিবীক্ষণ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
অসংগতিপূর্ণ উপকরণ ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় ঢাকা অঞ্চলে—৩২১টি। এরপর ময়মনসিংহে ২৪৯টি, খুলনায় ১৯৪, রংপুরে ১৯৩, বরিশালে ১৫৩, চট্টগ্রামে ১৩৫, রাজশাহীতে ১৩২, কুমিল্লায় ১১১ ও সিলেট অঞ্চলে ৬৯টি বিদ্যালয় রয়েছে। খুলনা অঞ্চলের ঝিনাইদহের শৈলকুপার একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা ক্লাস মনিটরিংয়ের সময় দেখা যায়, ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সেখানে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও ছিল না।
শিক্ষক সংকটও এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৫ হাজার ২৯৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে তিন হাজারের বেশি শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি। আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি পড়াতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন, তবু তাঁকে এ বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়। এমনকি ইংরেজি শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে একই সময়ে ইংরেজির ক্লাসও তাঁকে সামলাতে হয়েছে।
মাউশির তিন মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর একটি উচ্চবিদ্যালয়েই ১২টি অভিযোগ। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের একটি বিদ্যালয়ে ছয়টি, নারায়ণগঞ্জ সদরের একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি, বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের একটি বিদ্যালয়ে চারটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে প্রযোজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত বা দৃশ্যমান নেই। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতির পাশাপাশি প্রশিক্ষণের পর সেই জ্ঞান প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত অনুসরণও হয় না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। যৌন হয়রানি রোধেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কমিটির বিষয়ে জোর দেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি ও অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।



