দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিক্ষানগরী হিসেবে এখন পরিচিতি পেয়েছে সিলেট। এক সময় উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেটের শিক্ষার্থীদের ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলকাতায় যেতে হতো। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। সৈয়দ মোস্তফা আলীর আত্মকথা গ্রন্থের ভূমিকায় সিলেটের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রামের সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবুল ফজল। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, তিন ভাই সৈয়দ মোস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তজা আলী ও সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা। কনিষ্ঠের সাহিত্যখ্যাতি সর্বজনবিদিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হতে না পেরে সৈয়দ মোস্তফা আলী তখনকার ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তার এক বছর পরে। সৈয়দ মুর্তজা আলী প্রেসিডেন্সি কলেজে আর সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করেছেন। গত শতকের শেষ দিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে উচ্চশিক্ষা নিতে হতো সিলেটের শিক্ষার্থীদের। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সিলেটে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বর্তমানে সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে তিন জেলায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাতটি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজসহ আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখছে। ১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা শাবিপ্রবি সিলেট অঞ্চলের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর এক দশক পরে ২০০১ সালে সিলেটে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় লিডিং ইউনিভার্সিটি। এরপর সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং আরটিএম আল কবীর ইন্টারন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় এখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ নেই। শাবিপ্রবির উপাচার্য মো. খায়রুল ইসলাম জানান, উচ্চশিক্ষার প্রসারে শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। উদ্ভাবন, গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সচেষ্ট রয়েছে তারা। ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৮ সালে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২০ সালে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একই বছরের ১৮ নভেম্বর সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আলিমুল ইসলাম বলেন, কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। ভালো গবেষক তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের সহযাত্রী হিসেবে কাজ করছে। সিলেট অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর বাইরে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মুরারিচাঁদ কলেজ, মদনমোহন কলেজ, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ, হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও অন্তত ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে অধ্যয়ন করছেন। প্রতি বছর কৃতিত্বের সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে বের হচ্ছেন। সিলেটে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে আটজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে দূরের শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে হতো, ফলে অনেকে আগ্রহ হারাতেন। এখন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় সুযোগ বেড়েছে। পড়াশোনা শেষ করে অনেকে নাসা, মাইক্রোসফট, ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত এবং আবাসন সংকটের মতো সমস্যাও রয়েছে। শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই বলেই মন্তব্য করেন তারা। মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ জহিরুল হক মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে উচ্চশিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠবে সিলেট। চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৬২ সালে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ যাত্রা শুরু করে। এর তিন দশক পরে ১৯৯৫ সালে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ এবং ১৯৯৮ সালে নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। ২০১৭ সালে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জে সরকারিভাবে একটি মেডিক্যাল কলেজ চালু হয়। উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষার জন্য সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের চতুর্থ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া একটি ডেন্টাল কলেজ, ১০টি নার্সিং কলেজ ও একটি আইএসটি টেকনোলজি ইনস্টিটিউট রয়েছে। সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, চিকিৎসাশিক্ষার বিকাশে সিলেটে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বিদেশ থেকেও অনেকে এখানে পড়তে আসছেন, যা আশার বিষয়।