যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই বারবার শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে থাকার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু বাস্তবে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—কোনো দলই শ্রমজীবী পেশায় দীর্ঘ সময় কাটানো মানুষদের প্রার্থী হিসেবে তেমন গুরুত্ব দেয় না। ক্ষমতার উচ্চাসনে শ্রমজীবী মানুষের এই প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে নিরাপত্তা কর্মসূচি, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক সুরক্ষা আইন দুর্বল থাকে—যদি শ্রমজীবী পেশার মানুষরা বেশি সংখ্যায় নির্বাচিত হতেন, তাহলে এই অবস্থা হয়তো ভিন্ন হতো।
গবেষকরা শ্রমজীবী পেশা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কায়িক শ্রমের কাজ, যেমন নির্মাণ শ্রমিক; সেবামূলক কাজ, যেমন রেস্টুরেন্টে ওয়েটার; এবং অফিস সহায়ক কাজ, যেমন রিসেপশনিস্ট। ছোট ব্যবসার মালিক বা উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন এমন পেশার মানুষদের এই সংজ্ঞার মধ্যে ধরা হয়নি। অবশ্য কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম রয়েছে—নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ বারটেন্ডার ছিলেন, মেইনের সিনেট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন কাঠুরে হিসেবে কাজ করেছেন, আর ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর জিম টোমস ট্রাকচালক ছিলেন। সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লফভেন এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও এই তালিকায় আছেন। কিন্তু এই ব্যতিক্রমগুলো গণমাধ্যমে আলোচিত হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি কিন্তু বদলায়নি।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ শ্রমজীবী পেশায় নিয়োজিত। কিন্তু রাজ্য বিধানসভা বা কংগ্রেসে এই শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও একই রকম। ২০১৬ সাল থেকে ৩০ লাখের বেশি জনসংখ্যা আছে এমন ১০৩টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে ৯৭টি দেশের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, বিশ্বের গড় গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২ শতাংশ।
অনেকে মনে করেন, নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় বা শ্রমিক ইউনিয়নের দুর্বলতা এর কারণ। কিন্তু জার্মানি বা বেলজিয়ামে প্রার্থীদের সরকারি তহবিল দেওয়া হয়, ফিনল্যান্ডে অধিকাংশ শ্রমিক ইউনিয়নভুক্ত—সেখানেও শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ৫ শতাংশের নিচে। তাহলে কি শ্রমজীবী মানুষদের কোনো যোগ্যতার ঘাটতি আছে? গবেষণায় দেখা গেছে, তা নয়। শ্রমজীবী প্রার্থীরা সাদা-কলার পেশাজীবীদের মতোই যোগ্য, নির্বাচনে দাঁড়াতে আগ্রহী এবং জয়ের সম্ভাবনাও সমান।
গবেষকদের মতে, আসল সমস্যা হলো তারা খুব কমই নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। প্রচারণা চালানো ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য—সময় ও শক্তি লাগে, বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে সহিংসতা পর্যন্ত ঝুঁকি থাকে এবং ফলাফল অনিশ্চিত। জরিপে দেখা গেছে, সাদা-কলার পেশাজীবীদের তুলনায় শ্রমজীবী মানুষরা কাজ থেকে ছুটি নিয়ে প্রচারণা চালানোর সময় বিল পরিশোধ করতে পারবেন কি না, সেই উদ্বেগে নির্বাচনে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয় রাজনৈতিক দল ও স্বার্থগোষ্ঠী, যারা প্রার্থী বাছাইয়ের সময় শ্রমজীবী মানুষদের এড়িয়ে যান এবং মনে করেন সাদা-কলার পেশাজীবীরাই প্রচারণায় বেশি সফল হবেন।
তবে গবেষকরা মনে করছেন, এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের জন্য লেখা এক প্রতিবেদনে তারা বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। স্বল্পমেয়াদে প্রার্থী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা রাজনৈতিক বৃত্তি চালু করা যেতে পারে, যেমন নিউ জার্সির এএফএল-সিআইও-এর লেবার ক্যান্ডিডেটস স্কুল। দীর্ঘমেয়াদে শ্রমজীবী মানুষের জন্য দলীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কোটা চালু করা বা এলোমেলোভাবে নির্বাচিত নাগরিক জুরি যারা নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দেবে, এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কিন্তু গবেষকদের সতর্কবার্তা, যদি বাস্তবসম্মত সংস্কার পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব কখনোই উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাবে না।




