বর্তমান সময়ে শিশু নিখোঁজ এবং অপহরণের মতো মর্মান্তিক ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই উৎকণ্ঠা কমাতে এবং সন্তানের সঠিক অবস্থান জানতে ছোট জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, কেবল দাম বা প্রযুক্তির চাকচিক্য দেখে ডিভাইস কেনা উচিত নয়। বিশেষ করে নজরকাড়া স্মার্টওয়াচ শিশুর নিরাপত্তার বদলে অনেক সময় অপরাধীদের আকর্ষণ বাড়িয়ে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এমন ডিভাইস বেছে নেওয়া শ্রেয় যা আকারে ছোট, সহজে বহনযোগ্য এবং চোখের আড়ালে রাখা সম্ভব।
জিপিএস ট্র্যাকার মূলত নির্দিষ্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তির অবস্থান নির্ণয় করে অভিভাবকের ফোন বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাঠিয়ে দেয়। এর অন্যতম বড় সুবিধা হলো রিয়েল-টাইম লোকেশন এবং লোকেশন হিস্ট্রি, যা থেকে জানা যায় শিশুটি কোন পথ দিয়ে কোথায় গিয়েছে। এছাড়া 'জিওফেন্স' ফিচারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করলে সতর্কবার্তা পাওয়া যায় এবং জরুরি প্রয়োজনে 'এসওএস' বাটনের সাহায্যে দ্রুত অভিভাবককে জানানো সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, এটি চূড়ান্ত নিরাপত্তা নয়; বরং একটি অতিরিক্ত তথ্য উৎস। নেটওয়ার্কের অভাব, ব্যাটারি শেষ হওয়া বা ডিভাইসটি খুলে ফেলার মতো সীমাবদ্ধতা এখানে প্রবল।
প্রযুক্তিগতভাবে, জিপিএস স্যাটেলাইট সরাসরি কাউকে অনুসরণ করে না। স্যাটেলাইট থেকে আসা বেতার সংকেত ট্র্যাকার গ্রহণ করে নিজের অবস্থান হিসাব করে এবং এরপর মোবাইল নেটওয়ার্ক বা সিম কার্ডের মাধ্যমে সেই তথ্য অভিভাবকের কাছে পাঠায়। ফলে খোলা আকাশের নিচে এর নির্ভুলতা বেশি থাকলেও ভবন বা দেয়ালের ভেতরে সংকেত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন ধরনের ট্র্যাকার পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, জিএফ-২১ জিএসএম মিনি ট্র্যাকার (দাম ৩,৩০০ টাকা) আকারে অত্যন্ত ছোট এবং পোশাকের ভেতর রাখা সহজ। সাইনোট্র্যাক এসটি-৯০৩ (দাম ৩,৪৫০ টাকা) ওয়াটারপ্রুফ এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাকিংয়ের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে সাইনোট্র্যাক এসটি-৯৫ (দাম ৬,৪৯৯ টাকা) শক্তিশালী ব্যাটারি সমৃদ্ধ হলেও আকারে বড় হওয়ায় এটি শিশুদের চেয়ে যানবাহনের জন্য বেশি কার্যকর। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ইজিট্র্যাক্স পিএল২০০ (দাম ৮,০০০ টাকা) বিটিআরসি অনুমোদিত এবং এতে দুইমুখী কলিং ও ৯০ দিনের লোকেশন হিস্ট্রি সুবিধা রয়েছে। এছাড়া হোকো ওয়াই১০৮-এর মতো স্মার্টওয়াচ (দাম ৩,৯৯০ টাকা) বাজারে থাকলেও এর দৃশ্যমানতার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যায়।
ডিভাইস কেনার সময় অভিভাবকদের কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রথমত, ডিভাইসটি ফোর-জি নেটওয়ার্ক সমর্থন করে কি না এবং বিটিআরসি অনুমোদিত কি না তা যাচাই করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং লোকেশন আপডেটের ফ্রিকোয়েন্সি পরীক্ষা করা উচিত। এছাড়া পানি ও ঘাম থেকে সুরক্ষার জন্য ওয়াটারপ্রুফ রেটিং থাকা প্রয়োজন। স্বল্পমূল্যের ট্র্যাকারগুলো অনেক সময় সঠিক লোকেশন দিতে ব্যর্থ হয়, তাই গুণগত মান যাচাই করা আবশ্যক।
বিকল্প হিসেবে ব্লুটুথ ট্র্যাকার যেমন অ্যাপল এয়ারট্যাগ বা অ্যান্ড্রয়েড ফাইন্ড হাব ব্যবহৃত হয়। তবে এগুলো সরাসরি মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে না, বরং আশপাশের অন্যান্য ডিভাইসের ব্লুটুথ সংকেতের ওপর নির্ভর করে। তাই ছোট শিশুদের জন্য এগুলো ফোর-জি ট্র্যাকারের বিকল্প হতে পারে না। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন কার্যকর হলেও ব্যাটারি শেষ হওয়া বা ফোন বন্ধ করার ঝুঁকি থাকে।
পরিশেষে, জিপিএস ট্র্যাকার কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। শিশুর নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি সচেতনতা, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মতো বহুমুখী নিরাপত্তা স্তর থাকা জরুরি। ট্র্যাকারটি এমন জায়গায় স্থাপন করতে হবে যাতে শিশুর শারীরিক ক্ষতি না হয়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে 'সন্তানকে শেষ কোথায় দেখা গেছে'—এই প্রশ্নের উত্তর দ্রুত পেতে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে।




