আকাশ বা ভূমির লড়াই ছাড়িয়ে এখন যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে সমুদ্রের গভীর তলদেশ। সমুদ্রতলে ছড়িয়ে থাকা ইন্টারনেটের সাবমেরিন কেবল এবং জ্বালানি পাইপলাইনের মতো কৌশলগত অবকাঠামোগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো পানির নিচে ব্যবহারের উপযোগী অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জ্বালানি খাতের নাশকতা সংবলিত যাকে বলা হয় 'হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার' বা সংকর যুদ্ধের আশঙ্কাই এই পরিবর্তনের মূল কারণ।
যুক্তরাজ্যের থিংক ট্যাংক 'চ্যাথাম হাউস'-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো কাটিজা বেগো মনে করেন, পরিবর্তিত হুমকি পরিবেশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন সমুদ্রতলের নজরদারিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বর্তমানে 'অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেইকল' (AUV) এবং বিভিন্ন সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই অবকাঠামোগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণের চেষ্টা চলছে। ২০২২ সালে বাল্টিক সাগরের নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং তাইওয়ান ও আর্কটিক অঞ্চলের বিভিন্ন ঘটনা নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সমুদ্রতলের নিরাপত্তা কতটা অবহেলিত ছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু নাগাদ বিশ্বে ১৫ লাখ কিলোমিটারের বেশি সাবমেরিন কেবল সচল থাকবে। এই নেটওয়ার্ক কেবল তথ্য আদান-প্রদান নয়, বরং অফশোর বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের কার্যকারিতা দেখে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো এখন সমুদ্রতলের জন্য একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করছে। ইতালীয় জাহাজ নির্মাতা 'ফিনক্যান্টিয়েরি' জুলাই মাসে প্রায় ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে চারটি কোম্পানির অংশীদারিত্ব কিনেছে, যাতে তারা প্রথাগত সাবমেরিন তৈরির বাইরে ছোট ড্রোন ও বিশেষ টেলিকমিউনিকেশন প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠে। ফিনক্যান্টিয়েরির সিইও পিয়েররোবার্তো ফোলগেরিওর মতে, ভবিষ্যতে বড় যুদ্ধজাহাজগুলো 'মাদারশিপ' হিসেবে কাজ করবে এবং সমুদ্রতলের ছোট ছোট যানের নেটওয়ার্ককে সমন্বয় করবে। একইভাবে ফ্রান্সের 'থালেস' গোষ্ঠীও মাইন শনাক্তকরণ ও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে জার্মানির 'ইউরোঅ্যাটলাস' তৈরি করেছে 'গ্রে শার্ক' নামক এক স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান। কোম্পানিটির চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার ভেরিনিয়া কোড্রিয়ানের মতে, এই ড্রোনটি মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নির্দিষ্ট এলাকায় টহল দিতে পারবে এবং বাধা শনাক্ত করে রিপোর্ট করতে সক্ষম হবে। এটি প্রচলিত ফ্রিগেট বা সাবমেরিনের চেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর, কারণ বিশাল সমুদ্রের প্রতিটি মাইল মানবচালিত যান দিয়ে পাহারা দেওয়া অসম্ভব। তবে এই প্রযুক্তির ফলে এক নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে—'মেশিন বনাম মেশিন' লড়াই। অর্থাৎ, বন্ধুপ্রতীক দেশগুলোর ড্রোন শনাক্ত করতে এবং শত্রুপক্ষের স্বয়ংক্রিয় যান মোকাবিলা করতে এখন 'অ্যান্টি-অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেইকল' মিশনের প্রয়োজন হচ্ছে।
ইউরোঅ্যাটলাস বর্তমানে হাইড্রোজেন ফুয়েল-সেলের মাধ্যমে এমন সংস্করণ তৈরি করছে যা একটানা ১৬ সপ্তাহ বা ৮ হাজার নটিক্যাল মাইল চলতে পারবে। যদিও এই ড্রোনগুলো বর্তমানে অস্ত্রসজ্জিত নয়, তবে নজরদারি ও শনাক্তকরণে অত্যন্ত কার্যকর। ইউরোপীয় কিছু নৌবাহিনীর সঙ্গে ইতিমধ্যে ১০ কোটি ইউরোর বেশি মূল্যের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও সমুদ্রতলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১০ লাখ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া এই অবকাঠামোগুলোর মালিকানা বেসরকারি কোম্পানির হাতে থাকায়, সরকারি সামরিক সুরক্ষা এবং বেসরকারি রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। আকাশপথের তুলনায় পানির নিচে দৃশ্যমানতা কম এবং সিগনাল আদান-প্রদান কঠিন হওয়ায় এটি প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি জটিল। কাটিজা বেগোর মতে, এআই ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন সহায়ক হতে পারে, তবে এটি সমুদ্রতলের নিরাপত্তার কোনো 'জাদুকরী সমাধান' নয়। বর্তমানে রাশিয়া ও চীনও এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।




