স্মার্টফোনের মতোই বর্তমান সময়ে মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে হেডফোন বা ইয়ারফোন। অফিস, গণপরিবহন, ঘর কিংবা শরীরচর্চার সময় এর ব্যবহার এখন সর্বব্যাপী। আধুনিক যুগের হেডফোনগুলো এখন আর কেবল গান শোনার যন্ত্র নয়, বরং এতে যুক্ত হয়েছে উন্নত সব প্রযুক্তি। বিশেষ করে 'এয়ারপডস প্রো ৩'-এর মতো উচ্চমানের মডেলগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে 'অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন' বা এএনসি (ANC) প্রযুক্তি। প্রযুক্তি সংবাদ সাইট এনগ্যাজেট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাইরের কোলাহল দূর করে শব্দের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে এই ফিচারটি অত্যন্ত কার্যকর, যা অনেক ব্যবহারকারীর কাছে এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কফি শপের গুঞ্জন বা রাস্তার যন্ত্রপাতির শব্দ রুখতে এটি দারুণ কাজ করলেও এর কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জানা প্রয়োজন।
পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে এএনসি প্রযুক্তি কাজ করে। যদিও এই প্রযুক্তির উদ্ভব কয়েক দশক আগে হয়েছিল, তবে সম্প্রতি ভোক্তা পর্যায়ে এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এই সিস্টেমটি চালিত হয় ইয়ারফোনে থাকা একাধিক মাইক্রোফোনের মাধ্যমে, যা প্রতিনিয়ত চারপাশের পরিবেশের শব্দ যেমন—গাড়ির হর্ন, মানুষের আলাপন বা শিশুর কান্নার আওয়াজ পর্যবেক্ষণ করে। বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি এবং তরঙ্গ থাকে। যখন দুটি বিপরীতমুখী তরঙ্গ একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন তারা একে অপরকে বাতিল করে দেয়, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় 'ডেস্ট্রাকটিভ ইন্টারফিয়ারেন্স' বলা হয়। এএনসি প্রযুক্তিটি বাইরের অডিও ধারণ করে তা বিশ্লেষণ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিপরীত তরঙ্গ তৈরি করে, ফলে বাইরের অধিকাংশ শব্দ কানে পৌঁছানোর আগেই বাধা পায়। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি মিলি সেকেন্ডের ব্যবধানে সম্পন্ন করতে হয়, যার জন্য শক্তিশালী প্রসেসর বা চিপের প্রয়োজন। এই জটিল প্রযুক্তির কারণেই এএনসি সমৃদ্ধ ডিভাইসের দাম সাধারণ 'প্যাসিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন' ডিভাইসের চেয়ে বেশি হয়। উল্লেখ্য, প্যাসিভ ক্যানসেলেশন কেবল ইয়ারকাপের মাধ্যমে কানকে বাহ্যিক শব্দ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ওপর নির্ভর করে।
এএনসি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে জীবনযাত্রায় বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যেমন, দীর্ঘ বিমান যাত্রায় বা অতিরিক্ত কোলাহলের মাঝে এটি শান্তি প্রদান করে। বাইরের শব্দ বাধাগ্রস্ত না করায় গান বা সিনেমার নিখুঁত সুর উপভোগ করা সম্ভব হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাইরের শব্দ ঢাকতে ব্যবহারকারীকে ভলিউম খুব বেশি বাড়াতে হয় না, যা শ্রবণশক্তি রক্ষা করতে সাহায্য করে। এছাড়া ফোন কলে স্পষ্ট কথা শোনা এবং গান না শুনে কেবল নীরবতা বজায় রেখে পড়াশোনা বা কাজে মন দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত বাহ্যিক শব্দে বিরক্ত হন বা ঘুমের জন্য নীরবতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদস্বরূপ।
তবে এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। এএনসি প্রযুক্তিটি এয়ারকন্ডিশনার বা বিমানের ইঞ্জিনের মতো একটানা ও নিচু শব্দের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর, কিন্তু হঠাৎ করে আসা জোরালো চিৎকার বা হর্নের শব্দ পুরোপুরি আটকাতে পারে না। কিছু মডেলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই ফিচারটি চালু থাকলে অডিওর গুণগত মান কিছুটা হ্রাস পায় এবং দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারে অনেকে কান ব্যথার কথা জানান। এছাড়া সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। রাস্তা পার হওয়া বা সাইকেল চালানোর সময় চারপাশের শব্দ শুনতে না পাওয়ায় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পাশাপাশি, এই ফিচার চালু রেখে অন্যের সাথে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে এবং গবেষণায় দেখা গেছে এটি মস্তিষ্কের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ ফিল্টার করার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে অনেক কোম্পানি এখন 'ট্রান্সপারেন্সি মোড' বা হাইব্রিড অপশন যুক্ত করছে। এছাড়া এএনসি চালু থাকলে ব্যাটারির দ্রুত ক্ষয় হয়, যা ব্যবহারকারীদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।




