কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত উন্নয়ন ও এর সাথে জড়িত ঝুঁকিগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি অনেক শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রণের অভাব, সাইবার হামলা এবং বায়োটেররিজমের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি সতর্ক করেছেন যে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এখন এআই-এর কারণে নতুন হুমকির মুখে। যেহেতু অল্প কয়েকটি এআই মডেল এবং ক্লাউড প্রোভাইডারের ওপর অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ভরশীল, তাই কোনো একটি দুর্বলতা দ্রুত পুরো ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত জুলাই মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের প্রথম 'গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স'-এর সহ-নেতৃত্ব প্রদানকারী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রযুক্তির জন্য এখন একটি সাধারণ বৈশ্বিক নিয়মনীতি প্রয়োজন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো নতুন এআই সিস্টেম প্রকাশের আগে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা উচিত। এছাড়া ডেভেলপারদের নিরাপত্তা প্রোটোকল প্রকাশ করতে হবে এবং ব্যবহারের পর যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করতে হবে। ১৭০টি দেশ, শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজ এই আলোচনায় অংশ নিয়ে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছে।

জাতিসংঘের পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর করার জন্য তিনটি প্রধান পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত, বিজ্ঞান এবং নীতি নির্ধারণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করা। বর্তমানে যারা এআই ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করছেন এবং যারা কূটনৈতিক আলোচনা করছেন, তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। বিজ্ঞান প্যানেলের তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নগুলোকে আগামী মে মাসের আলোচনার মূল প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক মানবধিকার আইন এবং প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নিরাপত্তার একটি সাধারণ রেফারেন্স বেসলাইন তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে ও ই ই সি ডি (OECD), জি-৭ হিরোশিমা কোড অফ কন্ডাক্ট, ২০২৪ সিউল সামিটের প্রতিশ্রুতি এবং ইউনেস্কোর নৈতিক নির্দেশিকাকে অনুসরণ করা যেতে পারে। কোস্টারিকার জাতীয় এআই কৌশলের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দেশীয় পরিকল্পনা তৈরি করা কার্যকর।

তৃতীয়ত, ভৌগোলিক ও আর্থিক বৈষম্য দূর করে এই আলোচনাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। স্বল্প আয়ের দেশগুলোর গবেষক ও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের জন্য আইপিসিসি (IPCC)-র মতো একটি বিশেষ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য 'ক্রস-বর্ডার রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স' চালুর কথা বলা হয়েছে, যা আর্থিক খাতের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনোভেশন নেটওয়ার্কের মতো কাজ করবে।

আগামী মে মাসে গ্লোবাল ডায়ালগের পরবর্তী বৈঠকের আগে বিজ্ঞান প্যানেলের মূল্যায়ন, নিরাপত্তা বেসলাইন এবং একটি ক্রস-বর্ডার স্যান্ডবক্স পাইলট প্রকল্প চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যদি অল্প কিছু প্রভাবশালী পক্ষ এআই শাসনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বিশ্বের বাকি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।