অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তান কথা বলতে দেরি করলে অটিজমের কথা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কথা বলতে দেরি হওয়া মানেই যে শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত, তা নয়। অটিজম হলো স্নায়ুর বিকাশজনিত একটি জটিলতা, যার লক্ষণগুলো সাধারণত জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এর প্রধানত তিনটি দিক লক্ষ্য করা যায়: প্রথমত, মৌখিক বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করতে সমস্যা হওয়া; দ্বিতীয়ত, সামাজিক বিকাশে বাধা আসা এবং তৃতীয়ত, সীমাবদ্ধ চিন্তাভাবনা ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণের মাধ্যমে গণ্ডিবদ্ধ জীবনযাপন করা।
বিশ্বজুড়ে প্রতি ৫৪ জনে একটি শিশুর অটিজমের ঝুঁকি থাকে, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে অন্তত ১৭টি শিশু এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যদিও অটিজমের কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি, তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রসবকালীন জটিলতা এবং সময়ের আগে জন্ম নেওয়া অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া মা-বাবার বয়স, গর্ভকালীন রুবেলা বা জিকার মতো ভাইরাল ইনফেকশন, বায়ুদূষণ এবং বিভিন্ন জিনগত ত্রুটি এই রোগের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। কিছু নির্দিষ্ট জেনেটিক ডিজঅর্ডার, যেমন ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম বা রেট সিনড্রোমের কারণেও মস্তিষ্কের কোষের পরিবহনব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি হয়, যা রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। তবে মনে রাখা জরুরি যে, ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক গ্রহণের সাথে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এর জন্য মা-বাবা, বিশেষ করে মা কোনোভাবেই দায়ী নন।
অটিজম পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। গর্ভাবস্থায় মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুর সঠিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও অপুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা, ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ এবং ধূমপান, অ্যালকোহল ও মাদক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা প্রয়োজন। অকারণে ওষুধ খাওয়া এবং ইনফেকশন অবহেলা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অটিজম কোনো অভিশাপ নয় এবং এটি ধনী-দরিদ্র বা শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে যে কারো সন্তানের হতে পারে। এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। যেখানে শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিদ, স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, শিক্ষক এবং পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং থেরাপির মাধ্যমে শিশুর আচরণ, শিক্ষা, ভাষা এবং সামাজিক দক্ষতার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটানো সম্ভব।




