শহুরে ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; ঢাকার অদূরেই রয়েছে নদীপাড়ের মনোরম কিছু জায়গা, যেখানে একদিনের জন্য ঘুরে আসা সম্ভব। বিশেষ করে বিরুলিয়া, সাভার, সিংগাইর এবং রূপনগরের নদী তীরের পরিবেশ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ আকর্ষণীয় হতে পারে। তুরাগ, বংশী বা কালীগঙ্গার বিস্তৃত জলরাশি কিংবা বর্ষায় জলমগ্ন খোলা মাঠ বা চকের ওপর নৌকা ভ্রমণ—প্রতিটি জায়গার অভিজ্ঞতা ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময়। শীত আসার আগে এই অঞ্চলগুলোর রূপ বদলে যায়; নিচু জমিগুলো পানিতে ডুবে ছোট ছোট বিলের মতো রূপ নেয়, যা নৌভ্রমণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
বিরুলিয়া ভ্রমণের জন্য তুরাগ নদীর তীর এবং বিরুলিয়া সেতু প্রধান আকর্ষণ। মিরপুর-১ বা ১০ থেকে স্থানীয় বাসে করে বিরুলিয়া সেতু বা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে রিকশা বা অটোরিকশায় করে ঘাটে যাওয়া যায়। এছাড়া গাবতলী হয়ে আমিনবাজার অথবা উত্তরা-দিয়াবাড়ি হয়েও এখানে পৌঁছানো সম্ভব। বিরুলিয়ায় ছোট নৌকার পাশাপাশি বড় দল হলে ছাদওয়ালা নৌকা ভাড়া করা যায়। এমনকি 'দ্য রিভার এইজ' রেস্টুরেন্টের নিচ থেকেও নৌভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।
সাভারের মনু মিয়া ঘাট নদী ভ্রমণের জন্য আরেকটি জনপ্রিয় স্থান, যা ভাগলপুর এলাকায় অবস্থিত। সাভার থানা স্ট্যান্ড থেকে এনাম মেডিকেল পার হয়ে এখানে যাওয়া যায়। এখানে খোলা নৌকা অথবা রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাদওয়ালা নৌকা বেছে নেওয়া সম্ভব। তবে নৌকা পাওয়া এবং সময়সীমা সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যদিকে, যারা দীর্ঘ সময় কাটাতে চান, তারা সাভারের বংশী নদী বেছে নিতে পারেন। সকালে পৌঁছে নাশতা করা, দেড় ঘণ্টা নৌভ্রমণ এবং দুপুরে নদীর ধারে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে পুরো দিনটি সাজানো যায়। শরতের সময়ে নদীর পাড়ে ফুটে থাকা কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে নৌকায় করে কাশবনের কাছে যাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।
রূপনগরের পরিবেশটি কিছুটা ভিন্ন। এটি সাভার থেকে রিকশায় ৩০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। বর্ষাকালে এখানকার নিচু চকগুলো পানিতে ডুবে জলভূমির রূপ নেয়, তবে এখানে সারা বছর নৌভ্রমণ করা যায় না। তাই যাওয়ার আগে পানি জমেছে কি না এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে সিংগাইর ব্রিজের নিচের অংশটি বর্ষায় অত্যন্ত নিরিবিলি ও সুন্দর হয়ে ওঠে। ঢাকা থেকে গাবতলী বা আমিনবাজার হয়ে মানিকগঞ্জগামী বাসে করে এখানে যাওয়া যায়।
নৌকার ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই। নৌকার আকার, যাত্রীর সংখ্যা, ইঞ্জিনের উপস্থিতি এবং ভ্রমণের সময়ের ওপর ভিত্তি করে ভাড়া নির্ধারিত হয়; সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা ভাড়া হতে পারে। চাঁদনি রাতে নৌভ্রমণ এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে, তবে সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মাঝি এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।
নিরাপদ ভ্রমণের জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ঝড়, বজ্রপাত বা ভারী বৃষ্টির সময় নৌভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে আরামদায়ক। সাথে পানিরোধী ব্যাগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ছাতা এবং বাড়তি পোশাক রাখা ভালো। নৌকার ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ না তোলা এবং কিনারায় ঝুঁকে ছবি না তোলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা; প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট নদীতে না ফেলে সাথে রাখা ছোট ব্যাগে সংগ্রহ করে তীরে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা উচিত, যাতে নদী নির্মল থাকে।




