গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ: যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ তার বক্তব্যে সতর্ক করে বলেন, অনেক সময় অভিভাবকরা মনে করেন আত্মীয় বা পরিচিতদের কাছে সন্তান নিরাপদ, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়। তাই সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা এবং তাদের কথা মন দিয়ে শোনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এছাড়া ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সেক্সুয়াল গ্রুমিং ও সাইবার ফ্ল্যাশিংয়ের মতো ঝুঁকি সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করার কথা বলেন।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর যুগ্ম সচিব মো. খলিলুর রহমান খান মনে করেন, কেবল আইন দিয়ে নির্যাতন কমানো সম্ভব নয়; অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দিক বিবেচনা করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে পুরোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং শিশুদের অভিযোগকে বিচারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ঢাকা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানান, পুলিশি কার্যক্রম মূলত প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও বিচার—এই তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়। তবে সামাজিক লোকলজ্জা ও আর্থিক সমঝোতার কারণে অনেক ঘটনা নথিভুক্ত হয় না, যা অপরাধীর খালাসে সহায়তা করে। তিনি প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু হেল্পডেস্কের কথা উল্লেখ করেন এবং আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনার উন্নতির কথা বলেন।
হলি ক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা গোমেজ শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার সমন্বয়ের কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কেবল মেয়েশিশুরা নয়, ছেলেশিশুরাও এখন বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিটের পরিচালক সমীর মল্লিক বলেন, শিশু আইন ২০১৩-এর বিধিমালা প্রণয়ন এবং মাঠপর্যায়ে কমিউনিটি বেজড চাইল্ড প্রটেকশন কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা জরুরি। এছাড়া অনলাইন যৌন শোষণ রুখতে বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের প্রস্তাব দেন তিনি।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স-এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা গবেষণার বরাত দিয়ে জানান, প্রায় ৯২ শতাংশ শিশু পরিচিত গণ্ডির ভেতরেই প্রথম নির্যাতনের শিকার হয়। তিনি জানান, করোনাকালীন সময়ে অনলাইন নির্যাতনের ঝুঁকি ব্যাপক বেড়েছে। সংগঠনের চেয়ারপারসন সামিয়া আফরীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে শিশু সুরক্ষাকে কার্যকর করার এবং ট্রমাগ্রস্ত শিশুদের জন্য পেশাদার কাউন্সেলিং সেবার প্রসারের কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান শিশুদের 'ব্যক্তিগত সীমানা' বা স্পেসের গুরুত্ব আলোচনা করেন এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের বিশেষ ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেন।
বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক আবাসন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং বাল্যবিবাহকে সরাসরি নির্যাতন হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। টেরে দেস হোমস নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ম্যানেজার নজরুল ইসলাম একটি সমন্বিত রেফারেল পাথওয়ে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিশুদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুপারিশ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারওয়াত সিরাজ অভিযুক্ত অপরাধীদের একটি জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরির কথা বলেন, যাতে ধারাবাহিক অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হয়। সেভ দ্য চিলড্রেন-এর পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন অনলাইন গেমের ঝুঁকি এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট যাচাইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেন। এছাড়া 'শিশুরাই সব' সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, পথশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে এবং ছেলেশিশুদের ধর্ষণ আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পরিশেষে, টেরে দেস হোমস ফাউন্ডেশনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জিনিয়া আফরোজ মনে করেন, শিশুরা তখনই নিরাপদ বোধ করে যখন কেউ তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনে।




