যশোরের কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহুদিন ধরেই চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা চলছে। হাসপাতালটির ৫০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চললেও ভৌত অবকাঠামো ও জনবল দুটোই অপ্রতুল। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গত দুই বছর ধরে এক্স-রে যন্ত্রটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আর গত চার বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি থাকলেও তার জন্য কোনো চালক নেই। ফলে জরুরি রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তর করতে গিয়ে বারবার বেগ পেতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালটির বহির্বিভাগে রোগীদের ভিড় প্রতিদিনই লেগেই থাকে। ২৪ আগস্ট অন্তর্বিভাগে ৮২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ৬৪৩ জন। চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে রোগীদের লম্বা সারি ছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও হাসপাতালে মাত্র ২৪ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, যদিও মোট পদ রয়েছে ৪৩টি। বাকি ১৯টি পদ খালি — এর মধ্যে অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজি, চক্ষু, চর্ম ও সার্জারি বিভাগের ৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ১৪ জন সাধারণ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এছাড়া ১১৮ জনের জায়গায় মাত্র ৭৭ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আছেন; চতুর্থ শ্রেণিতে ২৩ জনের পদে আছেন মাত্র ১৪ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অবস্থা আরও করুণ — পাঁচটি পদের বিপরীতে রয়েছেন একজন।

হাসপাতালটির অবস্থান খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, খুলনার ডুমুরিয়া এবং যশোরের মনিরামপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু ওষুধের চরম সংকটও রোগীদের হতাশ করছে। সাবদিয়া গ্রামের রোজিনা খাতুন ৪১ দিনের শিশুসন্তানকে নিয়ে ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ২৪ আগস্ট হাসপাতালে এসেছিলেন। তিনি জানান, ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হলেও ওষুধ দেওয়া হয়নি। এর আগে ১৫ দিন আগেও তিনি হাসপাতালে এসেছিলেন, তখনো কোনো ওষুধ পাননি। দুই বছরের মেয়েকে নিয়ে আসা ঊর্মি খাতুন বলেন, এত বড় হাসপাতালে সরকারি ওষুধই যদি না মেলে, তাহলে কী ধরনের সেবা রোগীরা পাচ্ছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, গড়ে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৪৫০ জন এবং অন্তর্বিভাগে প্রায় ১০০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেকে মেঝেতেই চিকিৎসা নেন। বার্ধক্যজনিত সমস্যা নিয়ে আসা ৭০ বছর বয়সী ভানু বিবিকে চিকিৎসক বুকের এক্স-রে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করতে বলেন। রক্ত-প্রস্রাবের পরীক্ষা হাসপাতালে হলেও এক্স-রে যন্ত্র অচল থাকায় তাঁকে বাইরে থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে পরীক্ষাটি করাতে হয়েছে। তাঁর স্বজন আব্দুল খালেক জানান, হাসপাতালে এক্স-রে করলে খরচ হতো মাত্র ২২০ টাকা। অথচ বাইরে থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে সেবা নিতে হয়েছে।

একই চিত্র জরুরি পরিবহণেও। ২১ আগস্ট কেশবপুর শহরের খালিদুর রহমানের ভাগনি অসুস্থ হলে জরুরি ভিত্তিতে তাকে খুলনায় নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ করতে হয়েছে। অথচ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মাত্র ১ হাজার ২০ টাকা। কেশবপুর নাগরিক সমাজের সভাপতি আবুবক্কর সিদ্দিকী বলেন, নানা সংকটের কারণে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রেহেনেওয়াজ বলেন, চালক না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের গাড়ির চালক দিয়ে মাঝেমধ্যে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এক্স-রে মেশিন নষ্ট হওয়ার বিষয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ায় ওষুধ ফুরিয়ে গেছে, নতুন করে ওষুধ কেনা হলে চাহিদামতো সরবরাহ সম্ভব হবে। যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা জানান, চালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ওষুধের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ওষুধ সংকট কমে যাবে। নতুন এক্স-রে মেশিন কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।