সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গত চার মাসে এখানে পাঁচটি প্রাণহানিকর দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে আগস্ট মাসের মাত্র ২০ দিনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু—উভয় শ্রেণির পর্যটকেরই এমন করুণ মৃত্যু ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে আসা শিক্ষার্থী আবদুল মাজেদ (২৪) গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে মারা যান। এর আগে ২১ আগস্ট ফরিদপুরের ১০ বছর বয়সী শিশু রোকাইয়া নূর চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে এবং ৭ আগস্ট সিরাজগঞ্জের ৭২ বছর বয়সী আলী আকবর খান গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান। জুন মাসে নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে মৃত্যু হয় মৌমাতা সরকার এবং মে মাসে নাচতে নাচতে পানিতে পড়ে প্রাণ হারান তামিম ইসলাম (১৭)।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাওরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তার বিধিবিধান মানার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিহত পাঁচজনের কারোরই শরীরে লাইফ জ্যাকেট ছিল না। এছাড়া অনেক নৌযানে লাইফবয় রিংয়ের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই এবং পর্যটকদের তা ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা হয় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্চস্বরে গান বাজানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়েও নিয়ম মানা হচ্ছে না, যা পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ আগস্ট ‘টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি’র এক সভায় জেলা প্রশাসনের জারি করা ১৩ দফা নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই নির্দেশনায় সংরক্ষিত এলাকায় নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সভায় জানানো হয়, হাওরে বর্তমানে চার শতাধিক নৌকা ও দুই শতাধিক বিলাসবহুল হাউসবোট থাকলেও নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে মাত্র ৪৯টি। হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং তাহিরপুর নৌকা মালিক সমিতির অনুরোধে আবেদনের জন্য আরও দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এরপরও নিবন্ধন না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে প্রশাসন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। নিবন্ধনহীন কোনো নৌযান পর্যটক বহন করতে পারবে না। অন্যদিকে, হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আরাফাত হোসাইন জানান, অনেক হাউসবোট নিয়ম মেনেই চলছে, তবে বিভিন্ন দিক থেকে আসা অননুমোদিত নৌকাগুলোর কারণে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা মনে করেন, দুর্ঘটনা রোধে সব নৌযানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং প্রশাসন, মালিক ও পর্যটক—সবার সমন্বিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় অবস্থিত ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে ১০৯টি বিল ও অসংখ্য খাল-নালা রয়েছে। গত বছরের ৬ নভেম্বর সরকার ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ’ জারি করলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।




