গত আগস্টের শেষভাগে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে একটি শিশু হাসপাতালে, যার ফলে প্রাণ হারায় ১৪ জন নবজাতক। জানা গেছে, এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটির কারণে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় এবং দ্রুত তা নার্সারি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ইনকিউবেটরে থাকা ১৫টি শিশুর মধ্যে মাত্র একটি বেঁচে ফেরে। নিরাপত্তা কর্মীর অনুপস্থিতিতে নার্সারির দরজাগুলো তালাবদ্ধ থাকায় উদ্ধারকর্মীরা শিশুদের বাঁচাতে ব্যর্থ হন। এই ঘটনাটি দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবহেলিত চ্যালেঞ্জ এবং অভিজাত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমানের মধ্যকার চরম বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

জাপানি নিউজ প্ল্যাটফর্ম নিক্কেই এশিয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফারহান বোখারি উল্লেখ করেছেন যে, এই ট্র্যাজেডি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একদিকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নিজ দেশের নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ঘটনার পর দেশটির শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে সরকার তদন্তের নির্দেশ দিলেও, তা কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৬ সালে দেশটি ১৪৭তম স্থানে থাকলেও বর্তমানে তা পিছিয়ে ১৬৮তম স্থানে নেমে এসেছে এবং 'নিম্ন মানব উন্নয়ন' শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পাকিস্তান তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় করেছে ঋণ পরিশোধে, অথচ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল এক শতাংশেরও কম। সমালোচকদের মতে, সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অপরিহার্য খাতের বদলে ছয় লেনের মহাসড়কের মতো অবকাঠামো প্রকল্পে অধিক অর্থ ব্যয় করেছে।

দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার আরেকটি বড় কারণ হলো কর ফাঁকি। সরকারি তথ্যানুসারে, জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশের কম মানুষ আয়কর দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত, যেখানে প্রভাবশালীরা কর প্রদানে ব্যাপক ফাঁকি দিচ্ছেন। এছাড়া আইএমএফ-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির কারণে পাকিস্তান প্রতি বছর জিডিপির ৫ থেকে ৬.৫ শতাংশ হারায়, যা দেশটির স্বাস্থ্য খাতের মোট বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ছয় গুণ।

প্রতিরক্ষা খাতেও পাকিস্তানের বিপুল ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সংঘর্ষের কারণে জাতীয় নিরাপত্তায় শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে দেশটি। ২৫ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার।

ফারহান বোখারি মনে করেন, সংকট উত্তরণে পাকিস্তানকে দুটি প্রধান পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রথমত, জনসেবামূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর আদায় ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি দীর্ঘদিনের এই বকেয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও এমন শোচনীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।