শিশুদের শরীরে প্রকাশ পাওয়া কিছু স্নায়বিক লক্ষণকে অনেকেই ইচ্ছাকৃত আচরণ মনে করেন, যা একেবারেই ভুল ধারণা। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মন ও শরীরের চাপ সামলানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এবং মস্তিষ্কের কাজের ধরনে অস্থায়ী পরিবর্তনের কারণে শিশুদের দেহে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে কার্যকরী স্নায়বিক উপসর্গজনিত সমস্যা, অর্থাৎ ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিজঅর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। তাই এ ধরনের লক্ষণকে অবহেলা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কও কাম্য নয়।

এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে হঠাৎ হাঁটার অসুবিধা দেখা দিতে পারে। হাঁটতে গেলে বারবার পড়ে যাওয়া, পা শক্ত হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ে দুর্বলতা বা অবশ ভাব—এসব ঘটনা ঘটতে পারে। কথা আটকে যাওয়া, এমনকি হঠাৎ কথা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও থাকতে পারে। অস্বাভাবিক কাঁপুনি, অদ্ভুত নড়াচড়া, খিঁচুনির মতো অবস্থা (যদিও এটি মৃগীরোগ নয়), চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও প্রকাশ পেতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, কিন্তু বড় কোনো রোগ প্রায়শই ধরা পড়ে না। চিকিৎসক যখন জানান যে গুরুতর কিছু নয়, তখন পরিবার আরও বিভ্রান্ত ও ভীত হয়ে পড়ে। অনেকেই বারবার চিকিৎসক বদলাতে থাকেন এবং নতুন নতুন পরীক্ষা করানোর প্রবণতা তৈরি হয়।

এই অবস্থার পেছনে সবসময় একক কোনো কারণ পাওয়া যায় না। পরীক্ষা ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক অশান্তি, বুলিং, অপমান ও হয়রানি, মানসিক আঘাত, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, আবেগ প্রকাশ করতে না পারা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুটি নিজেও বুঝতে পারে না যে তার ভেতরের মানসিক চাপ শারীরিক উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

অভিভাবকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো সন্তানকে বিশ্বাস করা। শিশুকে দোষারোপ করা, লজ্জা দেওয়া বা অতিরিক্ত আতঙ্ক প্রকাশ করা—এসবই ক্ষতিকর হতে পারে। আবার শিশুর সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেও সুস্থ হতে দেরি হতে পারে। নিরাপত্তা বজায় রেখে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রুটিন—ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সামাজিক জীবনে—ফেরানোর জন্য সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না। নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা, পড়াশোনায় সাময়িক সমন্বয় আনা, বুলিংয়ের শিকার হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ধীরে ধীরে স্কুলে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসার পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। শিক্ষক, অভিভাবক ও চিকিৎসকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখলে চিকিৎসার ফলাফল ভালো হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও শিশু মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন।