বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মারায়ন তং পাহাড়ঘেঁষা 'মেঘের অরণ্য' নামের ওয়াইল্ড ক্যাম্পে দুই রাত কাটিয়ে এসেছেন ১১ সদস্যের এক ভ্রমণদল। দিগন্তজোড়া মেঘ ও সবুজ পাহাড়ের কোলে সাদা মেঘের চাদর আর দূরে নীল আকাশ মিলে তৈরি হওয়া অনন্য দৃশ্যে মুগ্ধ হয়েছেন তারা। দলের একজন তানিম বলেন, পাহাড় কখনো কাউকে হতাশ করে না, করতেই পারে না। প্রায় এক মাসের পরিকল্পনার পর ১৪ আগস্ট যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা থেকে বাসে কক্সবাজারের চকরিয়া, সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে আলীকদম বাসস্ট্যান্ড হয়ে অটোরিকশায় পৌঁছান তারা। শেষে পাহাড়ের খাড়া ঢাল পেরিয়ে ক্যাম্পে পৌঁছানোর পরই দূরের পাহাড়ে নেমে আসে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠান্ডা জলে ধুয়ে যায় পথের ক্লান্তি। বৃষ্টি থামার পর দিগন্তে উঁকি দেয় রংধনু, যা দেখে মুগ্ধ হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন সকলে। দুপুরে জুমঘরে জুম চালের ভাত, আলুভর্তা, ডাল আর পাহাড়ি মুরগির মাংসের আয়োজন করেন ক্যাম্প কর্মীরা। ক্ষুধার্ত পেটে এই খাবার অমৃতের চেয়ে কম মনে হয়নি। ক্যাম্পে বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় দিনে মাত্র এক ঘণ্টা জেনারেটর চালু হয়। এমন সংকটেও কারও ছবি ও ভিডিও ধারণের আগ্রহ কমেনি। শিলবুনিয়া ঝরনায় গিয়ে দলের কয়েকজন চার্জের অভাবে মুঠোফোন রেখে প্রকৃতির ভাবনায় ডুবে যান। কেউ কেউ জুমঘরের কোনায় গল্পের আসর বসান, কেউ খোলা বারান্দায় শুয়ে তারা গোনার চেষ্টা করেন, আবার কেউ একাই হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন। সকালে জুমঘরের খোলা অংশ দিয়ে সূর্যের নরম আলো ঢুকতেই ঘুম ভাঙে সবার। বারান্দা থেকে দেখা যায় সাদা মেঘের ভিড়, আর নিচে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীর শান্ত স্রোত। পাহাড় থেকে সমতলের দিকে নেমে যাওয়া আঁকাবাঁকা সড়কগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল একেকটি আস্ত অজগর। পাহাড়ে পানি তোলা কষ্টসাধ্য হওয়ায় গোসলের জন্য বৃষ্টির অপেক্ষা করতে হয়। একদিন বেলা একটায় দলটি শিলবুনিয়া ঝরনায় গোসলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে বিকেল পাঁচটায় ফেরে। পথে তারা একটি ম্রো পাড়াও পরিদর্শন করে। ফিরে এসে তারা যে মুগ্ধতার বর্ণনা দেয়, তা শুনে আফসোসে পুড়তে থাকে বাকিরা। রাতের গল্প-আড্ডার মধ্যে হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে মেঘ এসে তাদের সবাইকে ঢেকে দেয়, কিছুক্ষণ পর তা আবার উড়েও যায়। ফেরার দিন সকালে বৃষ্টির কারণে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। বিকেলে রোদ উঠলে দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেন তারা। পাহাড়ের ভেজা পথে পিছলে পড়েন দু-একজন, তবে অন্যরা সহায়তা করায় উঠে দাঁড়িয়ে ভালো গ্রিপের জুতা পরার শপথ করেন। আলীকদম বাজারে ফিরে চকোরিয়াগামী বাসে ওঠার পর দলের শিশির আবিষ্কার করেন তার ব্যাগ নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর হতাশ হয়ে রওনা দিলে কিছুদূর যেতেই বাসটি থামে। দেখা যায়, হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সেই অটোরিকশাচালক। ব্যাগটি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। শেষটা সুন্দর হওয়ায় চমৎকার কিছু স্মৃতি নিয়ে তারা ঢাকায় ফেরেন।