বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পরিবেশগত বিধিনিষেধ অমান্য করে একের পর এক অবৈধ রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে তোলা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এই নির্মাণকাজ পুনরায় গতি পায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পূর্ববর্তী সরকারের শেষ সময়ে ৭০টির বেশি রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মামলা ও জরিমানার মাধ্যমে এসব নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল, তবে বর্তমানে পুনরায় অন্তত ১২টি নতুন রিসোর্ট-কটেজ নির্মিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটন মৌসুমের বাইরে যখন টেকনাফের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কমে যায়, তখন এই অবৈধ নির্মাণকাজ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। দ্বীপের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত কেয়াবন এবং নারকেলগাছ কেটে স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া সৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু ও মূল্যবান চুনাপাথর সংগ্রহ করে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে, গত তিন দশকে এখানে ২৩০টির বেশি হোটেল-মোটেল তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানের চলমান নির্মাণসহ দ্রুতই ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, অধিকাংশ রিসোর্টের মালিক কক্সবাজারের বাইরের জেলার প্রভাবশালী ব্যক্তি। নির্মাণকাজে তদারকি, শ্রমিক সরবরাহ এবং নির্মাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে টেকনাফ থেকে আনা ইট, সিমেন্ট ও রডের একটি অংশ অবৈধভাবে রিসোর্ট মালিকদের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের মুখে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বর্তমানে ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর আওতায় কেয়াবন সৃজন, সামুদ্রিক কাছিমের আবাসস্থল রক্ষা এবং পরিযায়ী পাখির পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। কিন্তু অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম দ্বীপ পরিদর্শনের পর কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে এই অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের চেয়ে মানুষের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর পথে প্রধান অন্তরায়। দ্বীপটিকে বাঁচাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জেলা প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলে সেখানে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ২০১১ সালে হাইকোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্রহীন সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।