এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশজুড়ে আনন্দের ঢেউ বইছে। তবে যাদের সংগ্রামের গল্প সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী, তারা মূলত সেইসব শিক্ষার্থী, যারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও অসামান্য ফল করেছে। এমন চার মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনকথা তুলে ধরেছে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন। সাফল্যের পাশাপাশি তাদের পরিবারে এখন নতুন দুশ্চিন্তা—উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার খরচ কীভাবে জোগানো হবে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের হাজিরা আক্তার মিতু। এলাকাটি বছরের সাত-আট মাস পানিতে ডুবে থাকে, ফলে কাজের অভাবে অভাব সেখানে নিত্যসঙ্গী। এমন পরিবেশে মাকে বিলে মাছ ধরতে সাহায্য করেছে হাজিরা, আবার নিজেও টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগাত। স্থানীয় গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সে। বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়ে প্রতিদিন হেঁটে যেত। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার কারণে দৈনিক প্রায় ১০ ঘণ্টা পড়তে হতো। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তার। তবে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়ার খরচ নিয়ে পরিবার শঙ্কিত। পাঁচ শতক জমিই তাদের একমাত্র সম্বল। বাবা হোসেন আলী শীতকালে ইটভাটায় কাজ করেন, বাকি সময় দিনমজুরি করেন। মা শরিফা বেগম বিলে মাছ ধরে সংসার চালান। ছুটির দিনে ও স্কুল থেকে ফিরে মাকে মাছ ধরায় সাহায্য করত হাজিরা। পাশাপাশি পাড়ার ছোটদের পড়িয়ে কিছু আয়ও করত। মা বলেন, অনেক দিন খাবার জোটেনি, প্রায়ই মেয়েকে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। নিজেরা না খেয়েও সন্তানকে পড়িয়েছেন তিনি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত বসু জানান, পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়নি, সহায়ক বইপত্রও দেওয়া হয়েছে। একাগ্রতার জোরেই মেয়েটি ভালো ফল করেছে।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার খাটুরিয়া ধনীপাড়া গ্রামের মুসফিকুর রহমানের ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ। তার স্বপ্ন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া। এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। কিন্তু অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না—এই অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করছে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে প্রতিদিন হেঁটে যেত। বাবা মো. আবদুল কাদের বিভিন্ন হাটবাজারে গরু বেচাকেনার কাজ করেন। ছয় শতাংশের ভিটেটুকুই পরিবারের সম্বল। মুসফিকুর বলে, লেখাপড়া করে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হতে চায়, কিন্তু পরিবারের কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। এখন পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। মা মনিরা আক্তার পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। ছোট মেয়ে কামিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তিনি বলেন, ছেলে আরও পড়তে চায়, কিন্তু বাবার সামর্থ্য নেই। বাবা আবদুল কাদের জানান, তিনি নিজে লেখাপড়া জানেন না, ছেলে কলেজে ভর্তি হতে চায়, কিন্তু কোনো সামর্থ্য নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, মুসফিকুরকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সহযোগিতা পেলে সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ছুট লক্ষ্মীপুর গ্রামের নাদিয়া আফরিনের বাবা কেরামত আলী দিনমজুর। সংসারে তিন বেলা খাবার জোটানোই কষ্ট, সেখানে মেয়ের পড়ার খরচ জোগানো যেন বিলাসিতা। তবু দারিদ্র্য থামাতে পারেনি নাদিয়াকে। কোনো কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষক ছাড়াই এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে। বাবার ১০ শতক জমি থাকলেও তা চাষ করে তিন বেলার খাবার জোটে না। বাবা অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালান। কেরামত আলী বলেন, মেয়ের পড়ালেখার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। পেটে ভাত না থাকলেও বই ছাড়া থাকতে পারত না। যতটুকু পেরেছেন করেছেন, ধারদেনা করেও চেষ্টা করেছেন মেয়ের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে। মেয়ে চিকিৎসক হতে চায়, কিন্তু তার অবস্থায় সামনে পড়াশোনা অনেক কঠিন হবে। কলেজে ভর্তি, বই, যাতায়াত—সবকিছুতেই এখন অর্থসংকট। ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল নাদিয়া। প্রধান শিক্ষক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নাদিয়া সত্যি অনুকরণীয়। কঠিন বাস্তবতা থেকেও এমন ফলাফল বিরল। সে সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে অনেক দূরে যেতে পারবে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভার ধানগড়া পশ্চিম পাড়ার মরিয়ম খাতুন পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট। বড় চার বোনের কেউ সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত, কেউ নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে; সবার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু মরিয়ম সেই পথে হাঁটতে চায় না। পড়াশোনা করে দরিদ্র মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চায় সে। নিজের সংকল্পে অটুট থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে রায়গঞ্জ উপজেলা সদর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। মরিয়ম জানায়, উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। মা মোছা. গোলাপজান বলেন, আগের চার মেয়েকে নানা কারণে পড়ালেখা করাতে পারেননি। ছোট মেয়েটা শুরু থেকেই পড়ালেখায় ভালো, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাকে পড়ালেখা শেষ করার জন্য চেষ্টা করা হবে। বাবা নুরুল আমিন, যিনি রিকশাচালক, বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের পড়ালেখায় দারুণ ঝোঁক। যত কষ্টই হোক মেয়েকে পড়ালেখা করাতে চান। একটু সহযোগিতা পেলে মেয়েকে পড়ালেখা করাতে সুবিধা হতো।




