ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে চলাচলকারী সবকটি লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক মানুষ। ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা মহামারীর সময়ে প্রথমে চারটি লোকাল এবং একটি মেইল ট্রেন বন্ধ করা হয়েছিল। সর্বশেষ গত সোমবার বন্ধ হয়ে যায় স্থানীয়ভাবে 'নাসিরাবাদ মেইল' নামে পরিচিত ময়মনসিংহ মেইল ট্রেনটি। এর ফলে এই রুটে এখন কেবল আন্তনগর ট্রেন চলাচল করছে, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে এবং সব ছোট স্টেশনে থামে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে সাময়িকভাবে নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এই পরিষেবা পুনরায় কবে চালু হবে, সে বিষয়ে রেলওয়ের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, তিনটি রেক দিয়ে এই ট্রেনের চলাচল চালানো হতো, তবে গত এক মাস ধরে ট্রেনটি অনিয়মিতভাবে চলছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ঘোষণা ছাড়াই পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনটি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৬৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিত। এই দীর্ঘ পথে ট্রেনটি মোট ৫০টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিত এবং চট্টগ্রাম পৌঁছাতে দাপ্তরিকভাবে ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লাগত। ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেইসব যাত্রীরা যারা ছোট স্টেশনগুলো ব্যবহার করেন, কারণ আন্তনগর ট্রেনগুলো সেখানে থামে না। বিশেষ করে ইব্রাহিমাবাদ থেকে ভৈরব পর্যন্ত ৩৩৩ কিলোমিটার পথে ২৭টি স্টেশনে এই ট্রেনের যাত্রাবিরতি ছিল।
আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। ভৈরব থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার; যেখানে লোকাল ট্রেনে ভাড়া ছিল ৪০ টাকা এবং মেইল ট্রেনে ৫৫ টাকা, এখন আন্তনগর ট্রেনে যাতায়াত করতে খরচ হচ্ছে ১২৭ টাকা। কুমিল্লার কৃষিশ্রমিক আজিজুর রহমানের মতো অনেক যাত্রী এখন ট্রেন বন্ধ হওয়ায় সড়কপথে বিভিন্ন যানবাহন বদলে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া গুনছেন। অনেক শ্রমিক এখন তিন মাস আগে বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন না।
এই রেলপথটি ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। স্থানীয় ব্যবসা ও কৃষিপণ্যের পরিবহনে লোকাল ও মেইল ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ধান, দুধ, ডিম, মুরগি এবং শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম খরচে এক বাজার থেকে অন্য বাজারে নেওয়া যেত। লোকাল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৫ টাকা এবং মেইল ট্রেনে ১৫ টাকা, যেখানে আন্তনগর ট্রেনের সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৫ টাকা। ফলে এখন পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এবং স্টেশনকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান জানান, লোকোমোটিভের সংকট কমে এলে ট্রেনটি পুনরায় চালু করা হবে। তবে বর্তমানে মালামাল পরিবহনের সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে বিজয় এক্সপ্রেসের সাথে একটি লাগেজ বগি যুক্ত করা হয়েছে।




