বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আবাসন সংকটের মুখে এক নতুন প্রবণতা দেখা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। কোল্ডওয়েল ব্যাংকার রিয়েল এস্টেটের জন্য পরিচালিত হ্যারিস পোলের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ তাদের স্বপ্নের চাকরির চেয়ে স্বপ্নের বাড়ি পাওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমনকি নিজস্ব বাড়ির মালিক হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে তারা জীবনের অন্যান্য বড় লক্ষ্যগুলোকে সরিয়ে রাখতেও প্রস্তুত। যারা বর্তমানে বাড়ির মালিক নন, তাদের মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই ভবিষ্যতে নিজস্ব বাড়ি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চমূল্যের বাজারে টিকে থাকার তাগিদে এই প্রজন্মের তিন-চতুর্থাংশ তরুণ পুনরায় তাদের শৈশবের ঘরে অর্থাৎ বাবা-মায়ের কাছে ফিরে গেছেন অথবা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কোল্ডওয়েল অ্যাফিলিয়েটসের প্রেসিডেন্ট মেরি লি ব্লেইলক ফরচুন-কে দেওয়া এক মন্তব্যে জানান, জেন-জি প্রজন্মের কাছে বাড়ির মালিক হওয়া মানেই জীবন যুদ্ধে সফল হওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা বর্তমানে অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন এবং পরিবারের সাথে বসবাস করাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে বাড়ির মালিক হওয়া এখনো 'আমেরিকান ড্রিম'-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কঠিন বাস্তবতাকে মাথায় রেখে বর্তমান প্রজন্মের ৮৫ শতাংশ জেন-জি এবং ৮২ শতাংশ মিলেনিয়াল অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাড়ির ডাউন-পেমেন্টের জন্য সঞ্চয় শুরু করেছেন অথবা তা করার পরিকল্পনা করছেন।
রিয়েলটর ডটকমের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২ কোটি ৫২ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক তাদের বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করছিলেন, যা মোট তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি এমনকি অতিমারির সময়ে বাড়ি ফেরার প্রবণতার চেয়েও বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা বেকার বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা বাড়িতে থাকেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই চাকরিতে নিয়োজিত। এছাড়া পিউ রিসার্চের তথ্যমতে, এই তরুণদের ৭২ শতাংশই ঘরের বিভিন্ন খরচে আর্থিক অবদান রাখেন। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ ভাড়া বা মর্গেজ প্রদান করেন এবং ৬৫ শতাংশ মুদি পণ্য ও ইউটিলিটি বিলের খরচ বহন করেন।
মূল সমস্যাটি হচ্ছে, বেতন বৃদ্ধির তুলনায় আবাসন খরচ আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির গড় মূল্য ছিল ৪ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৩৪.৪ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি মাসিক গড় ভাড়া ১৭.৯ শতাংশ বেড়ে ১,৬৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া প্রায় ৪০ লক্ষ বাড়ির ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। করপোরেট স্তরে প্রবেশ পর্যায়ে থাকায় নিম্ন বেতন এবং চাকরির অনিশ্চয়তা তরুণদের আলাদাভাবে বাসা ভাড়া নেওয়া থেকে বিরত রাখছে।
হাউজিং রিসার্চ ফার্ম জেলম্যান-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আইভি জেলম্যান মনে করেন, এটি কেবল সাময়িক কোনো সমাধান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী জীবনধারার পরিবর্তন। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ সুদের হার এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বহুজাতিক পরিবারের (multigenerational living) ধারণাটি জনপ্রিয় হচ্ছে। ১৯৮০ সালে মাত্র ১৫ শতাংশ তরুণ বাবা-মায়ের সাথে থাকতেন, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৪ শতাংশে এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই হার স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জেলম্যান আরও জানান, বর্তমান তরুণদের মধ্যে বাবা-মায়ের সাথে থাকার সামাজিক জড়তা বা নেতিবাচক ধারণা অনেক কমে গেছে। এই প্রবণতার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রা ইউরোপীয় ধাঁচের বহুজাতিক পরিবারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।




