বাঙালিদের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিটি শুভ অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে দই একটি অপরিহার্য খাবার। বিয়ে থেকে শুরু করে পূজা-পার্বণ—সবখানেই এর বিশেষ স্থান রয়েছে। বিশেষ করে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দইয়ের জনপ্রিয়তা এখন বিশ্বজুড়ে। দইয়ের এই বৈশ্বিক প্রভাবের কথা মাথায় রেখে বুলগেরিয়ার পের্নিক প্রদেশের ‘ত্রার্ন’ শহরে একটি দই জাদুঘরও গড়ে তোলা হয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, দইয়ের সূচনা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৫ হাজার অব্দের দিকে মধ্য এশিয়া ও মেসোপটেমিয়ার যাযাবরদের মাধ্যমে। তারা দুধ বহনের জন্য পশুর চামড়ার থলে ব্যবহার করত। মরুভূমির তীব্র উত্তাপ এবং থলের ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে দুধ জমাট বেঁধে টক ও ঘন দইয়ে পরিণত হতো। যাযাবররা লক্ষ্য করেন যে, এই জমাট বাঁধা দুধ সাধারণ দুধের চেয়ে অধিক সময় সংরক্ষিত থাকে এবং এর স্বাদও চমৎকার।
বাংলাদেশে সাধারণত মিষ্টি ও টক—এই দুই ধরনের দই প্রস্তুত করা হয়। তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রথমে কাঠের আগুনে জ্বাল দিয়ে গরুর খাঁটি দুধ ঘন করা হয়। মিষ্টি দইয়ের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ে চিনি ও পোড়া চিনি মেশানো হয়। এরপর দুধের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তাতে আগের দিনের দই বা 'বীজ' মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই বীজের ব্যাকটেরিয়া দুধের প্রাকৃতিক শর্করা ব্যবহার করে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে, যার ফলে দুধ জমাট বেঁধে দইয়ের রূপ নেয়। সবশেষে এই মিশ্রণটি মাটির সরায় ঢেলে কাপড় বা চট দিয়ে মুড়িয়ে উষ্ণ স্থানে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা রাখা হয়।
দই সংরক্ষণে মাটির পাত্র ব্যবহারের পেছনে বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। মাটির পাত্রের গায়ে এমন কিছু ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে যা খালি চোখে দেখা যায় না। এই ছিদ্রগুলোর মাধ্যমে দইয়ের অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভূত হয়ে বেরিয়ে যায়, ফলে দই অধিক ঘন ও জমাটবদ্ধ হয়। একই সাথে এটি ভেতরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, যা দই জমার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। প্রাচীনকালে রেফ্রিজারেটর না থাকায় ভেজা কাপড়ে মুড়ে মাটির নিচে বা শীতল অন্ধকার ঘরে এই পদ্ধতিতে দই রাখা হতো। বর্তমানে ফ্রিজে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম তাপমাত্রায় দই রাখা হয় যাতে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা ধীর হয়ে দই অতিরিক্ত টক না হয়। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিক, কাচ কিংবা ফ্রিজ-ড্রাইং প্রযুক্তিতে দইকে পাউডারে রূপান্তর করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে দই সংরক্ষণে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দই একটি অম্লীয় খাবার যার পিএইচ (pH) মাত্রা কম। নিম্নমানের বা অনুমোদনহীন প্লাস্টিকের পাত্রে দই রাখলে থ্যালেটস বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান খাবারে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তবে 'ফুড-গ্রেড' পলিপ্রোপিলিন পাত্র নিরাপদ বলে মনে করা হয়। এছাড়া প্লাস্টিকের পাত্রে পানি শোষিত হয় না বলে সেখানে ছত্রাক বা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে, যা ফুড পয়জনিং ঘটাতে পারে। তাই দই কেনার সময় পাত্রের গুণগত মান যাচাই এবং মেয়াদের তারিখ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।




