কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট এলাকায় তিস্তা ও ধরলা নদীর ভয়াল রূপের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীভাঙনের এক করুণ বাস্তবতার উদাহরণ জয়নাল আবেদীন নামের এক ব্যক্তি, যাঁর জীবনজুড়ে ১৭ বার ঘর ভেঙেছে। ৮৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ শৈশব থেকেই ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার সাক্ষী, অথচ এতবার সর্বস্ব হারিয়েও তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। তাঁর অভিযোগ, ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের অবস্থান বা জীবনধারণের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। বর্তমানে তিনি 'মাঝের চর' নামক স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

একইভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন আবদুল খালেক, নওশাদ ও বেলালের মতো অনেকেই। আবদুল খালেকের ১২ ঘরের বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমি এখন নদীর গর্ভে। অভাবের তাড়নায় তিনি তাঁর ছেলেকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন, যদিও এর আগে তিনি ছেলেকে ছোটখাটো চাকরিতে দিতে চাননি। নওশাদের মতে, আগুনে বাড়ি পুড়লে অন্তত জমি বা পুকুর অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু নদীভাঙনে সবটুকু শেষ হয়ে যায়।

নদীভাঙনের ফলে সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের চিত্রও এখানে স্পষ্ট। অনেক সচ্ছল পরিবার রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। বিশেষ করে নারীরা চরম সংকটে পড়েন; গোসল বা শৌচাগারের মতো ন্যূনতম গোপনীয়তার জায়গাগুলোও তারা হারিয়ে ফেলেন। অনেক বৃদ্ধ মানুষ তাদের স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি বা প্রিয়জনের কবরের পাশে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন, যা তাদের মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

বসবাসের জন্য সামর্থ্যবানরা নতুন জমি কিনে ঘর তুললেও, দরিদ্ররা অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে বা সরকারি বেড়িবাঁধের ওপর অস্থায়ী ঘর গড়ে জীবন কাটাচ্ছেন। কুড়িগ্রাম সদরের মোগলবাসায় হযরত আলীর মতো অনেকে ২০ বছর ধরে বাঁধের ওপর বসবাস করছেন, কারণ ধরলা নদী তাদের সব কৃষি জমি গ্রাস করেছে। একসময় বাঁধের ওপর হাজার হাজার মানুষের বসতি থাকলেও সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় অনেককে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে এই মানুষগুলো এক অন্তহীন চক্রে আটকা পড়েছেন। জীবন বাঁচাতে তারা এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন, যা শোধ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ জানান, চরে আশ্রয় নেওয়া শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে তাঁর মতে, সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে নদীভাঙন রোধ করা এবং এই মানুষদের রক্ষা করা অবশ্যই সম্ভব। বর্তমানে তিস্তা ও ধরলার খুব সামান্য অংশে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা সামগ্রিক সংকটের তুলনায় অপ্রতুল।