সৌদি আরবকে বিশ্বের বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে দেশটির ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল, পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF)। সম্প্রতি রোমে অনুষ্ঠিত 'ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (FII) প্রায়োরিটি ইউরোপ' সম্মেলনে এই পরিকল্পনার কথা জানান পিআইএফ-এর গভর্নর ইয়াসির আল-রুমায়ান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো বিশ্বকে পুনরায় সৌদি আরবের দিকে ফিরিয়ে আনা।

পিআইএফ-এর পূর্ববর্তী কৌশলে সৌদি আরবকে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে গভীরভাবে একীভূত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্প্রতি অনুমোদিত ২০২৬-৩০ সালের কৌশল অনুযায়ী, এখন লক্ষ্য হলো সৌদি আরবকে বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রে পরিণত করা। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তহবিলটি তার মোট মূলধনের ৮০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে নিয়োজিত করবে। এর বিপরীতে বিদেশি বিনিয়োগের বরাদ্দ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি, যেসব প্রকল্প অত্যন্ত ব্যয়বহুল অথবা যেসব থেকে মুনাফা আসতে দীর্ঘ সময় লাগছে, সেগুলোকে এখন আর অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।

সৌদি আরবের বহুল আলোচিত 'ভিশন ২০৩০' এর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এই তহবিলটি তাদের কিছু উচ্চাভিলাষী 'গিগাপ্রজেক্ট'-এ বড় ধরনের কাটছাঁট শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অঞ্চল 'নিওম' (Neom)। এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ১০৬ মাইল দীর্ঘ এক ভবিষ্যৎমুখী রৈখিক মেগাসিটি 'দ্য লাইন', যা ৯ মিলিয়ন মানুষের জন্য পরিকল্পিত ছিল। তবে এখন এর প্রথম পর্যায়কে সংকুচিত করে মাত্র ১.৫ মাইলে নামিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে স্কি রিসোর্ট 'ট্রোজেনা'-র আকার ছোট করা হয়েছে এবং ২০২৯ সালের এশিয়া উইন্টার গেমস এখানে আয়োজন করার পূর্ব পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।

তবে এই সব কাটছাঁটের মাঝেও ২০৩০ সালের বিশ্ব বাণিজ্য মেলা 'এক্সপো' এবং ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজনের জন্য বিশাল বাজেটের প্রস্তুতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পিআইএফ এখন এমন সব প্রকল্প ও খাতের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যেখান থেকে দ্রুত মুনাফা আসা সম্ভব। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিওম প্রকল্পের মধ্যে ডেটা সেন্টারসহ শিল্প খাতের ওপর এখন বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের ফলে তেল রপ্তানি হ্রাস, দীর্ঘ কয়েক বছর তেলের নিম্নমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির কারণে রিয়াদ বর্তমানে আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করা ছাড়া রিয়াদ আর কোনো বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জন করতে পারেনি। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একদিকে ব্যয়বহুল অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অন্যদিকে তেলের আয় কমে যাওয়া ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন আল-রুমায়ান। সম্মেলনে তিনি তেল বাজারের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে আরামকো-কে আন্তর্জাতিক তেল সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং 'এনার্জি রিয়েলিজম' বা জ্বালানি বাস্তববাদের কথা বলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকদের সৌদি আরবে আকৃষ্ট করার আল-রুমায়ানের এই বিশাল স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।