বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতির আশঙ্কা দূর হয়ে এখন তেলের উদ্বৃত্ত বা গ্লাট (glut) হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওপেক প্লাস (OPEC+)। আগামী আগস্ট মাস থেকে প্রতিদিন আরও ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করার বিষয়ে একমত হয়েছে এই জোট। এর ফলে টানা পঞ্চম মাসের মতো উৎপাদন কোটা বাড়ানো হলো, যা মূলত পূর্ববর্তী উৎপাদন হ্রাস করার সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসার একটি অংশ। যুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট উৎপাদন কোটা প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বাজারে বর্তমানে তেলের দাম নিম্নমুখী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে যাওয়ায় বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আতঙ্ক প্রশমিত হয়েছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৭২ ডলারে নেমে এসেছে, যা এপ্রিল মাসের সর্বোচ্চ মূল্য ১২৬ ডলার থেকে অনেক কম এবং যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তরের কাছাকাছি। বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব গত সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ৬৩ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ফেব্রুয়ারি মাসের পর্যায়ের প্রায় ৯০ শতাংশ।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানি এখন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তরকেও ছাড়িয়ে গেছে। এনার্জি ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি 'কপলার' (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই দেশটি জুনে প্রতিদিন ৩৯.৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি করেছে। কপলার-এর সিনিয়র অয়েল অ্যানালিস্ট জোহানেস রুবাল জানান, ওপেক প্লাস ত্যাগ করার পর থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের মজুদ করা অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার থেকেও সরবরাহ বাড়িয়েছে, যার ফলে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে সরবরাহের এই ব্যাপক বৃদ্ধি বাজারে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। মর্গান স্ট্যানলি এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, চাহিদার কথা বিবেচনা না করে উৎপাদকরা এভাবে তেল পাম্প করতে থাকলে আগামী বছর বাজারে তেলের মারাত্মক উদ্বৃত্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীনের অবস্থান। সাধারণত চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, তবে কপলার-এর তথ্যমতে, গত এপ্রিল মাসে এই আমদানির পরিমাণ প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছিল। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল আমদানি কম করলেও চীন এখনো বড় আকারে তেল কেনা শুরু করেনি।

এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুদ্ধের সময় আটকে পড়া প্রায় ৬০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পুনরায় বাজারে এসেছে বলে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দূরবর্তী বাজার এবং এমনকি হাওয়াইয়ের ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছাচ্ছে।