বাংলাদেশের পাহাড়প্রেমীদের কাছে বান্দরবানের থানচি উপজেলা একটি পরিচিত নাম। এই অঞ্চলের নাইটিং মৌজার বাকলাই গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৩৮০ ফুট উঁচু বাকলাই ঝরনা। দেশের সর্বোচ্চ ঝরনার খেতাব নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সৌন্দর্যের দিক থেকে এটি এগিয়ে। কেওক্রাডং ও তাজিংডং পাহাড়ের মাঝামাঝি অবস্থান এই ঝরনার। রুমা থেকে ১১০ কিলোমিটার ও থানচি থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূর থেকে এটি দেখা যায়। স্থানীয়রা একে বাক্তালাই ঝরনাও বলে থাকেন।

ঝরনায় পৌঁছানো সহজ নয়। প্রথমে আলীকদম বা থানচি হয়ে যেতে হয়। কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে আলীকদম আসা সবচেয়ে সহজ পথ। আলীকদম থেকে চাঁদের গাড়ি বা জিপ ভাড়া করে থানচির দিকে রওনা দিতে হয়। পথে আর্মি ক্যাম্পে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হয়। সেখান থেকে ৭-১০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে ঝরনার পাদদেশে পৌঁছানো যায়। এই পথে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, ঝিরিপথ, ছোট বড় পাহাড় পাড়ি দিতে হয়। যাত্রাপথে ডিম পাহাড়ের মতো দর্শনীয় স্থানও চোখে পড়ে। বর্ষাকালে মেঘের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অনুভূতি সত্যিই রোমাঞ্চকর।

যাতায়াতের সময় সতর্কতা জরুরি। ভারী বর্ষণে ঝিরিপথে পানির স্রোত বেড়ে যায়, যাওয়া বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। স্থানীয় গাইড নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পথে পাহাড়ি জুমচাষ, বাঁশের বাগান, পাহাড়ি ফল ও কলাগাছ দেখা যায়। ঝরনার কাছে পৌঁছালে এর বিশালতা দেখে মুগ্ধ হতে হয়। পানির তীব্র বেগে নিচে আছড়ে পড়ার শব্দ মনে সঞ্চার করে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।

ঝরনা দেখে সেদিনই ফিরে আসতে হয়। আর্মি ক্যাম্প থেকে বিকেল পাঁচটার আগে ফিরে রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক। নইলে থানচিতে রাত কাটাতে হতে পারে। আলীকদমে থাকার ব্যবস্থা আছে, তবে আগে থেকে যোগাযোগ করা ভালো। খাওয়ার জন্য আলীকদমের পানবাজারে বেশ কিছু হোটেল আছে। ঢাকা থেকে সকালে পৌঁছে সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যার বাসে ফিরে আসা সম্ভব।

ঝরনায় যাওয়ার সময় সঙ্গে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা উপকরণ, ট্রেকিংসহায়ক জুতা, লাঠি ইত্যাদি নেওয়া উচিত। পথ পিচ্ছিল ও দুর্গম, তাই নতুন ট্রেকারদের না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সকাল ৯টা-১০টার মধ্যে হাঁটা শুরু করলে ভালোভাবে ঘুরে বিকেলে ফিরে আসা যায়। বর্ষায় ঝরনার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি থাকে, তবে পাহাড়ধসের সতর্কতা মনে রাখতে হবে।

বাকলাই ছাড়াও আশপাশে জিনসিয়াম ঝরনা, জাদিপাই জলপ্রপাত, তলাবং ঝরনা ও ক্যাপিটাল পাহাড়সহ আরও অনেক দর্শনীয় স্থান আছে। একসাথে ঘুরতে চাইলে পরিকল্পনা করে যাওয়া ভালো। প্রকৃতির এই অপরূপ নৈসর্গ্য দেখতে আগ্রহীরা অবশ্যই একবার ঘুরে আসতে পারেন, তবে নিরাপত্তা বিধি মেনে।