বর্তমান সময়ে সন্ধ্যার পর ঘরে আলো জ্বালালে প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট সবুজ রঙের পোকা দেখা যাচ্ছে। জানালার কাচ, দেয়াল কিংবা বাতির চারপাশে এদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয়ভাবে এই পোকাগুলো 'শ্যামা পোকা' নামে পরিচিত হলেও এর প্রকৃত ইংরেজি নাম 'গ্রিন লিফহপার' (Green Leafhopper) বা সবুজ পাতা ফড়িং। শরীর সরু এবং কিছুটা ত্রিকোণাকৃতির এই পোকাগুলো মূলত গাছের পাতা ও কাণ্ড থেকে রস শুষে জীবনধারণ করে। তাদের মুখের গঠন সুচের মতো, যা দিয়ে তারা উদ্ভিদের কোষ ভেদ করে রস সংগ্রহ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, লিফহপারের অনেক প্রজাতি রয়েছে, যার ফলে শুধু রং দেখে এদের নির্দিষ্ট করা কঠিন। বিশেষ করে ধানখেতে এরা অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এরা রস শুষে নেওয়ার পাশাপাশি টুংরো ভাইরাস ছড়াতে পারে, যা ফসলের ফলন কমিয়ে দেয়।

এই পোকাগুলো কেন কৃত্রিম আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিশেষ বিশ্লেষণ রয়েছে। ২০২৪ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, উড়ন্ত পোকারা আকাশের উজ্জ্বলতাকে ওপরের দিক হিসেবে চিহ্নিত করে ভারসাম্য বজায় রাখে, যাকে বলা হয় 'ডরসাল লাইট রেসপন্স'। কিন্তু রাতে ঘরের বা রাস্তার উজ্জ্বল আলো তাদের বিভ্রান্ত করে। ফলে তারা আলোকে ওপরের দিক ভেবে শরীর ঘোরাতে থাকে এবং সোজা পথে না গিয়ে আলোর চারপাশে ঘুরপাক খেতে থাকে।

কার্তিক মাসে এই পোকার উপদ্রব বাড়ার প্রধান কারণ হতে পারে ঋতু পরিবর্তন এবং আমন ধানের পাকার সময়। গাজীপুরে দীর্ঘ ছয় বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অক্টোবর ও নভেম্বরে এই পোকার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকে। যদিও প্রজাতিভেদে তাদের প্রজনন চক্র ভিন্ন, তবে ধানখেতে এদের সংখ্যা বাড়লে বাসাবাড়িতেও এদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে এই পোকাগুলো মানুষকে কামড়ায় কি না। মূলত গ্রিন লিফহপার রক্তভুক পোকা নয়, তাই তারা মশা বা ছারপোকার মতো রক্ত খাওয়ার জন্য মানুষকে কামড়ায় না। তবে ভুলবশত তারা মানুষের ত্বকে মুখ ফুটিয়ে দিতে পারে, যা থেকে হঠাৎ খোঁচা লাগার মতো অনুভূতি বা সামান্য ব্যথা হতে পারে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় প্রায় ৩৯ প্রজাতির লিফহপারের এমন আচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এরা সাধারণত বিপজ্জনক নয়। যদি কেউ এমন অনুভূতি পান, তবে সাবান-পানি দিয়ে জায়গাটি ধুয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনে ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। তবে তীব্র অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ঘরকে এই পোকার আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সন্ধ্যাবেলায় দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং জানালায় সূক্ষ্ম নেট ব্যবহার করা। উজ্জ্বল বাতিগুলো জানালার খুব কাছে না রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলো নিভিয়ে রাখলে এদের আকর্ষণ কমে। আলোর রং পরিবর্তন করে পোকা তাড়ানোর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঘরে পোকা ঢুকে পড়লে তা মারার প্রয়োজন নেই; বরং ঘরের বাতি নিভিয়ে বাইরের বাতি জ্বাললে তারা নিজে থেকেই বেরিয়ে যায়। এছাড়া লেবু, মরিচ বা কর্পূরের মতো ঘরোয়া উপায়ে পোকা তাড়ানোর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, বরং রাসায়নিকের ভুল ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।