কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউবনে এক দল পাখিপ্রেমীর দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর দেখা মিলল অত্যন্ত বিরল 'ভুজঙ্গ' পাখির। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই পাখিটির খোঁজ করছিলেন। বাংলাদেশে এই পাখিটি এতটাই দুর্লভ যে, এর দেখা পাওয়ার রেকর্ড ১০ বারেরও কম। এর আগে ডুলাহাজারা, ইনানী, কাপ্তাই, হাজারিখিল, লাউয়াছড়া এবং করমজলের মতো সীমিত কিছু স্থানেই এর উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
ভুজঙ্গ পাখির শারীরিক গঠন অনেকটা ফিঙের মতো হলেও কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এর গায়ের রঙ চকচকে কালো, চোখ গাঢ় বাদামি এবং ঠোঁট বেশ শক্তপোক্ত। উচ্চতা ২৭ থেকে ৩২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৪৪ থেকে ৬৮ গ্রামের এই পাখিটির স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ের অবয়ব একই রকম। তবে অল্পবয়সী ভুজঙ্গদের ক্ষেত্রে পিঠের রঙ ফ্যাকাশে কালচে-বাদামি এবং গলা ও বুকে সাদা তিল দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে একে 'কাকঠুঁটো ফিঙে', পশ্চিমবঙ্গে 'কাকচঞ্চু ফিঙে' এবং ইংরেজিতে 'Crow-billed Drongo' বলা হয়।
পাখিটির নামের রহস্য নিয়ে যথেষ্ট কৌতূহল রয়েছে। 'ভুজঙ্গ' শব্দের অর্থ সাপ, কিন্তু এর শারীরিক গঠনে সাপের কোনো ছাপ নেই। নামটির উৎস নিয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ বা ইতিহাস পাওয়া যায় না, তাই কেবল অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেকে মনে করেন, এর শিকারি স্বভাব অথবা ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে এই নাম দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। আবার কারো মতে, ফিঙের মতো চেরা লেজ দেখে সাপের জিভের কথা মনে হতে পারে, যদিও ভুজঙ্গের লেজ তুলনামূলক চওড়া এবং আগাটি বাইরের দিকে ছড়ানো।
ভুজঙ্গ মূলত পতঙ্গভুক হলেও এটি ব্যাঙ, ছোট পাখি এবং সরীসৃপ শিকার করে। এটি সাধারণত বনের নিচু অংশে ঝোপঝাড় ও লতাগুল্মের মধ্যে একা বা জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে এবং প্রায়শই ফিঙের দলের সাথে মিশে থাকে। গবেষকদের মতে, পাখিটি পন্থ-পরিযায়ী হতে পারে, অর্থাৎ অক্টোবর মাসে অন্য কোথাও যাওয়ার পথে অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করে। অন্যেরা একে 'ভবঘুরে' অতিথি হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রজনন সংক্রান্ত তথ্যে জানা যায়, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এই সময়ে তারা হিমালয় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি বনাঞ্চলে অবস্থান করে। মাটি থেকে ৪-১২ মিটার উচ্চতায় মাকড়সার জাল, ঘাস ও বাকল দিয়ে তারা বাটির মতো বাসা তৈরি করে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি যৌথভাবে বাসা বুনলেও ডিমের তত্ত্বাবধান করেন কেবল স্ত্রী পাখি। সাধারণত তিন-চারটি ফিকে গোলাপি ডিমে তা দেওয়া হয়, যা থেকে ছানা ফুটতে ১৪-১৫ দিন এবং উড়তে শিখতে আরও ১৫-২২ দিন সময় লাগে।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও এই পাখিটি সম্পর্কে তথ্যের অভাব থাকায় একে ‘তথ্য অপ্রতুল’ পাখি বলা হয়। তবে সম্প্রতি নভেম্বরের শুরুতে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও এই ধরনের দুটি পাখির দেখা মিলেছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।




