যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং বন সংলগ্ন এলাকায় বসতি বিস্তারের ফলে দাবানলে ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর মধ্যভাগের মধ্যে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার স্থাপনা এই আগুনের কবলে পড়তে পারে।

২০২৬ সালের দাবানল পরিস্থিতি এই ঝুঁকির এক ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের শুরুতে পশ্চিমাঞ্চলে পাহাড়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা দাবানলের পথ প্রশস্ত করে। জুন মাসে কলোরাডোর 'অ্যাসপেন একরস ফায়ার' শত শত স্থাপনা ধ্বংস করেছে। জুলাই মাসে কলোরাডো-ইউটা সীমান্তের কাছে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া 'নলেস ফায়ার'-এ চারজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী প্রাণ হারান। আগস্টে ওয়াশিংটনের স্পোকেন এলাকায় প্রবল বাতাসের কারণে ছড়িয়ে পড়া আগুনে ৮০০টির বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। কলোরাডোতে অক্টোবর শেষ হওয়া পর্যন্ত ৩ লাখ ১৮ হাজার একরের বেশি এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা ২০০০ সাল পরবর্তী বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির প্রায় দ্বিগুণ। জাতীয় পর্যায়ে অগ্নিনির্বাপক সংস্থানগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হওয়ায় টানা ৪৮ দিন সর্বোচ্চ সতর্কতাসহ 'প্রিপেয়ারডনেস লেভেল ৫' বজায় রাখতে হয়েছে, যেখানে ১০ বছরের গড় ছিল মাত্র ২৫ দিন।

গবেষণায় 'ফাস্ট ফায়ার' বা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া আগুনের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ২০০১ থেকে ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে আগুনগুলো একদিনে ৪ হাজার একরের বেশি এলাকা পুড়িয়ে ফেলে, সেগুলোকে 'ফাস্ট ফায়ার' বলা হয়। মোট দাবানলের মাত্র ২.৭ শতাংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হলেও, মোট স্থাপনা ধ্বংসের ৭৮ শতাংশ এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যয়ের ৬১ শতাংশ ঘটে এই দ্রুতগামী আগুনের কারণে।

দাবানলের এই ভয়াবহতা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে, যা মাটি ও গাছপালার আর্দ্রতা দ্রুত শুষে নিচ্ছে। এর ফলে বনভূমি অধিক শুষ্ক হয়ে পড়ছে। এছাড়া বনাঞ্চল ও তার সংলগ্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের ফলে ঝুঁকির পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। ১৯৪৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসতি ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন, যানবাহন বা ক্যাম্পফায়ারের মতো মানবসৃষ্ট কারণগুলো এখন গ্রীষ্মের বাইরেও সারা বছর আগুনের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে।

গবেষণাটি আরও সতর্ক করেছে যে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পশ্চিমী অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা মূলত নিম্নআয়ের মানুষের বসতি। এই মানুষগুলোর পক্ষে ঘরবাড়ি রক্ষা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া বা বীমা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই ঝুঁকি কমানোর উপায় রয়েছে। অগ্নিনিরোধক ছাদ এবং বাতাস চলাচলের পথে বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করে ঘরবাড়িকে নিরাপদ করা সম্ভব। এছাড়া বাড়ির চারপাশের শুকনো পাতা, কাঠ ও দাহ্য পদার্থ সরিয়ে ফেললে আগুনের বিস্তার কমানো যায়। কলোরাডোর ফায়ার কোড অনুযায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণ করলে খরচ খুব সামান্য (০.৬% থেকে ৪.২%) বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য লাভজনক। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি বনাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে আগুন জ্বালানো (prescribed burning) এবং বন উজাড়ের সঠিক পরিকল্পনা আগুনের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।