টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি বর্তমানে অত্যন্ত অদ্ভুত ও হতাশাজনক। এখানকার উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বাস্তবতার সাথে সরকারি কাগজপত্রের চরম বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। উপজেলার মোট ছয়টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে দুটি কেন্দ্রে কোনো স্থায়ী স্থাপনা বা ভবনই নেই, অথচ সেখানে চিকিৎসকের পদ বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব কেন্দ্রে ভবন রয়েছে, সেখানকার অধিকাংশটিতেই চিকিৎসক নেই।

সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ছয়টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র হলো—সদর, বড়চওনা, বহেড়াতৈল, বাঘেরবাড়ী, যাদবপুর এবং হাতীবান্ধা। এর মধ্যে সদর, বড়চওনা, বহেড়াতৈল ও বাঘেরবাড়ীতে অবকাঠামো থাকলেও সেবা প্রদানের অবস্থা শোচনীয়। এই চারটি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল বাঘেরবাড়ীতে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, তবে তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন সেখানে যান; বাকি সময় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কাজ করতে হয়। বড়চওনা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ে প্রেষণে কর্মরত। একইভাবে বহেড়াতৈল কেন্দ্রের চিকিৎসক মরিয়ম আক্তার দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেষণে আছেন। অন্যদিকে, সখীপুর সদর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত ১০ বছর ধরে কোনো চিকিৎসক নেই। সেখানে আয়েশা সিদ্দিকা নামের একজন কর্মকর্তা কর্মরত থাকলেও তিনি দুই বছর আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। বর্তমানে সেখানে কেবল সাইফুল আলম নামের একজন ফার্মাসিস্ট দীর্ঘ ছয় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।

অবকাঠামোগত সংকটের কথা বললে, বড়চওনা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। জরাজীর্ণ একটি ভবনে সেবা দেওয়া হচ্ছে যেখানে দেয়াল ফাটা, টিনের চালে মরিচা এবং ছিদ্র রয়েছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে এবং সেখানে বিদ্যুৎ, পানি বা ব্যবহারের উপযোগী শৌচাগার নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কেন্দ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ জমি দখল হয়ে গেছে এবং সীমানাপ্রাচীরও নেই। আবাসিক ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখানকার উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা রায়হান ফকির জানান, প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী এখানে আসেন, কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় তাঁর ও ফার্মাসিস্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যাদবপুর ও হাতীবান্ধা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিস্থিতি। এই দুটি কেন্দ্রের কোনো বাস্তব স্থাপনা নেই, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিতে এখানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে।Consequently, এই পদগুলোর চিকিৎসকেরা অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে কাজ করছেন। যাদবপুরের চিকিৎসক জান্নাত আরা জ্যোতি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এবং হাতীবান্ধার চিকিৎসক শামীমা আহমেদ ও উপসহকারী কর্মকর্তা রাশিদা আক্তার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেষণে কর্মরত আছেন।

সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেহানা পারভীন স্বীকার করেছেন যে, যাদবপুর ও হাতীবান্ধায় স্থাপনা না থাকা সত্ত্বেও পদ সৃষ্টি হওয়ায় চিকিৎসকেরা অন্যত্র কর্মরত। তিনি জানান, প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার জন্য উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত অনুরোধ জানানো হয়েছে। সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সিকদার মো. ছবুর রেজা বলেন, ভবনহীন কেন্দ্রে চিকিৎসক থাকা আর ভবন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক না থাকার এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।