জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাতের ফলে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর, মনিরামপুর এবং কেশবপুর উপজেলার প্রায় ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওই অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ দীর্ঘ তিন মাস ধরে পানিবন্দী জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক বাসিন্দা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ উঁচু সড়কের পাশে টিনের ছাপরা তুলে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের resident সুমিত্রা মণ্ডলের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এই চরম দুর্দশার কথা। তার শোবার ঘর ও উঠান তিন মাস ধরে পানিতে ডুবে থাকায় তাকে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। অসুস্থ স্বামী ও একমাত্র গরুর সাথে তিনি অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।Similarly, সুজাতপুর গ্রামের মহানন্দ মণ্ডল এবং অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাসের মতো অসংখ্য মানুষ তাদের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়ায় ঘর ছেড়ে রাস্তায় চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। দিপালী মণ্ডলের মতো অনেক নারী জানিয়েছেন, বাড়িঘর উঁচু করতে না পারায় তাদের প্রায় সারা বছরই এই জলাবদ্ধতার সাথে লড়াই করতে হয়।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস। পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী এবং হরি নদী তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়েছে, ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ নেই। এর ফলে এলাকার বিলগুলো উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে অভয়নগরের বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা এবং মনিরামপুরের হাটগাছা, সুজাতপুর ও লখাইডাঙ্গা সহ বহু গ্রাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সম্প্রতি ভবদহ স্লুইচগেটের ২১টি কপাট খুলে দেওয়া এবং কিছু নদী খনন করার ফলে পানি নামতে শুরু করেছে।

জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে দূর করতে কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) আওতায় বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পের অধীনে সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ পরিচালনা করছে। এর মধ্যে হরিহর নদ, আপার ভদ্রা এবং হরি নদীর কিছু অংশ খনন শেষ হয়েছে। এছাড়া ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি খালের প্রায় ৭৮ কিলোমিটার এলাকা পুনঃখনন করা হচ্ছে। পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানিয়েছেন, বর্তমানে ৮১.৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের কাজ চলছে এবং স্লুইচগেটের সব কপাট খোলা থাকায় দ্রুত পানি নেমে যাবে।

তবে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। তার মতে, কেবল খনন করে লাভ হবে না, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য এখনই 'টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট' (টিআরএম) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। অন্যথায়, কোটি কোটি টাকার এই খনন কাজ অপচয় হতে পারে। আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।