পারিবারিক সহিংসতা ও স্বামীর হাতে নির্যাতনের করুণ পরিণতিতে প্রাণ হারালেন আরও একজন নারী। সম্প্রতি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় ২০ বছর বয়সী আল মাইদা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশের হাতে নির্যাতনের শিকার হতেন তিনি। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে মাইদা তাঁর খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়াকে নিজের জখম শরীর ও ফোলা চোখের ছবি পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে, স্বামী তাঁকে আজও মেরেছে। তবে সন্তানদের কথা চিন্তা করে সংসার ছেড়ে আসতে রাজি হননি তিনি।
ঘটনার পর সিয়াম আল মুরসালিন আকাশ হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেলেও স্থানীয়রা তাঁকে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। মাইদার মা রহিমা খাতুন জানান, বিয়ের পর থেকেই মেয়েটি নির্যাতনের শিকার ছিল, এমনকি একবার সালিশ হলেও সিয়াম তা স্বাভাবিক পারিবারিক সমস্যা বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। মাইদার চার বছরের সন্তানের ভাষ্যমতে, বাবা মাকে মারধর করার পর ফ্যানে ঝুলিয়ে দেয় এবং পরে বন্ধুরা মিলে দেহটি নামিয়ে আনে। পলাশবাড়ী থানার ওসি সারওয়ার আলম খান জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে গলায় দাগ এবং পুরোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে; ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
একই ধরনের আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর খিলক্ষেতে, যেখানে মুক্তা ইসলাম নামের এক নারী সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় ditemukan। তাঁর মৃত্যুর আগে স্বামী সোহেল শিকদার নিজেই মুক্তার নির্যাতনের একটি ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং বোনকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে এবং তিনি সন্তানদের ঘুমানোর সুযোগ চাইছেন। পরিবারের দাবি, নির্যাতন করে তাঁকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে একে সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতাই নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের নির্যাতন সহ্য করে সংসার করার চাপ দেওয়া হয়। এছাড়া নারী নির্যাতনের মামলাগুলোকে 'ভুয়া' বলে অপপ্রচার চালানো হয়, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সমস্যা অত্যন্ত গভীর। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের মোট ২৭ হাজার ৯১১টি কলের মধ্যে ১৭ হাজার ৯৬০টি (প্রায় ৬২ শতাংশ) ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে। প্রতিদিন গড়ে ৭০টি কল আসে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে। বিবিএস ও ইউএনএফপিএ-র ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনসঙ্গীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, এ বছর আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ১০৮ জন নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’-র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক মনে করেন, কেবল আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; বরং মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি প্রয়োজন।




