ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলস বা ইউটিউব শর্টস—স্বল্পদৈর্ঘ্যের এসব ভিডিও দেখতে দেখতে অনেক সময় কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাত্র কয়েক মিনিট দেখার ইচ্ছে নিয়ে ফোন হাতে তুললেও অনেকেই দেখেন না কখন সময় পার হয়ে যায়। নিউরোইমেজ সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই অভ্যাসের পেছনের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ছোট ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কের মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে যুক্ত কিছু নির্দিষ্ট অংশের কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। ফলে ভিডিওটির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলে তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ব্যবহারকারী একটির পর একটি স্ক্রল করতে থাকেন। এই গবেষণার জন্য ৫৬ জন তরুণ-তরুণীর মস্তিষ্কের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পরীক্ষা করতে ব্যবহার করা হয় ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং বা এফএমআরআই প্রযুক্তি। একইসাথে মস্তিষ্কে গ্লুটামেট ও গাবার মতো নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা জানতে প্রোটন ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপিও ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে গবেষকেরা নজর দিয়েছিলেন মস্তিষ্কের কগনিটিভ কন্ট্রোল নেটওয়ার্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ডরসাল অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স (ডিএসিসি) এবং ডরসোল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (ডিএলপিএফসি)-এর দিকে। মনোযোগ ধরে রাখা, আচরণ নিয়ন্ত্রণ, বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জটিল কাজে এই দুটি অংশের ভূমিকা অপরিসীম।
গবেষণার সময় অংশগ্রহণকারীদের সামনে বিভিন্ন ধরনের ছোট ভিডিও তুলে ধরা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল মানুষের ছবি, পোষা প্রাণী, খেলাধুলা ও প্রকৃতির দৃশ্য। বেশিরভাগ ভিডিওর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ সেকেন্ডের কম। ভিডিওটি ভালো না লাগলে অংশগ্রহণকারীরা মাঝপথেই তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। পরবর্তীতে গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের পছন্দের ভিডিও এবং মাঝপথে বন্ধ করা ভিডিও—এই দুটি ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের তুলনা করেন। তুলনা করে দেখা যায়, কোনো ভিডিও যখন অংশগ্রহণকারীদের বেশি আকৃষ্ট করেছে, তখন মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে জড়িত মস্তিষ্কের অংশগুলোর কার্যক্রম কমে গেছে।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওতে একের পর এক স্ক্রল করে যাওয়ার প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করতে পারে। আকর্ষণীয় ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কের কগনিটিভ কন্ট্রোলের সাথে যুক্ত অংশগুলো কম সক্রিয় থাকলে ব্যবহারকারীদের পক্ষে ভিডিও দেখা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই অল্প সময় দেখার পরিকল্পনা নিয়েও অনেক সময় ব্যবহারকারীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে স্ক্রল করতে থাকেন।
তবে এই গবেষণা ফলাফলকে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই বলেও জানান গবেষকেরা। রিলস বা শর্টস দেখার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয় বা মস্তিষ্কের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়—এমন কোনো তথ্য এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি। শুধু ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কের কিছু অংশের কার্যক্রম সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি জানা গেছে।
এর আগেও ছোট ভিডিও দেখার মস্তিষ্কের সম্ভাব্য কগনিটিভ প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২৫ সালে নিকোলাস বার্টন ও মাইকেল স্মাইথের ‘কনটেক্সট-সুইচিং ইন শর্ট-ফর্ম ভিডিওস: হোয়াট ইজ দ্য ইমপ্যাক্ট অন প্রসপেক্টিভ মেমোরি?’ শীর্ষক গবেষণায় ছোট ভিডিওগুলোর দ্রুত প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, দ্রুত প্রেক্ষাপট পরিবর্তন কোনো কাজ করার কথা মনে রাখার সক্ষমতা বা প্রসপেক্টিভ মেমোরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া গত জুনে ‘দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব শর্ট ভিডিও ইউজেস অন প্রসপেক্টিভ মেমোরি আন্ডার ডিফারেন্ট কিউ টাইপ কন্ডিশনস’ শীর্ষক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ছোট ভিডিও দেখলে পরবর্তী কাজ করার কথা মনে রাখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে।




