কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট যে মানুষের মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে—এই উদ্বেগ ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। অনেকের মতে, এসব চ্যাটবট এক ধরনের 'মনস্তাত্ত্বিক দূষণ' ছড়াচ্ছে, যা সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই পরিস্থিতিতে, একটি সম্ভাব্য আইনি কৌশল হিসেবে এআই নির্মাতাদের বিরুদ্ধে পাবলিক নুইস্যান্স বা জনস্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের মামলা করার কথা ভাবা হচ্ছে। একটি দূষণকারী কলকারখানার সাথে এআই-এর প্রভাবের তুলনা টেনে এই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শের জন্য এআই-এর ওপর নির্ভর করছে, কিন্তু এই সিস্টেমগুলো অনেক সময় বিপজ্জনক পরামর্শ দিতে পারে, বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে এবং ক্ষতিকর আচরণে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে এআই নির্মাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। নিউ মেক্সিকোর একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মামলা এবং ফ্লোরিডার ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা এই আইনি পথ যে কার্যকর হতে পারে তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এআই নির্মাতারা ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা তুলে ধরলেও, সমর্থকরা বলছেন, শিশু-কিশোরসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে হলে এই পদক্ষেপ জরুরি। পাবলিক নুইস্যান্স আইনী হাতিয়ার হিসেবে উপযুক্ত কি না, নাকি এআই-নির্দিষ্ট নতুন আইন প্রয়োজন—এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেকেই এটিকে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসাবে দেখছেন।
আইনি ক্ষেত্রে পাবলিক নুইস্যান্স বলতে সাধারণত এমন কোনো আচরণকে বোঝানো হয় যা জনসাধারণের অধিকারে গুরুতর হস্তক্ষেপ করে। যেমন, কোনো কলকারখানা যদি স্থানীয় নদীর পানি দূষিত করে, তবে সেটি পাবলিক নুইস্যান্স হিসেবে গণ্য হয়। প্রশ্ন হলো, এআই চ্যাটবটকেও কি সেই একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে? যুক্তি অনুযায়ী, একটি এআই চ্যাটবট যখন একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের মনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তখন তা সেই এলাকার জনসাধারণের ওপর প্রভাব ফেলে। এর ফলে একটি শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে। তবে এই তুলনা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে 'পাবলিক নুইস্যান্স'-এর সংজ্ঞা ভিন্ন। ক্যালিফোর্নিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অশ্লীল বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায় আঘাত করে এমন যেকোনো কিছু, যা একটি সম্প্রদায় বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করে, তা পাবলিক নুইস্যান্স। তবে এই মামলা জেতা সহজ নয়। আদালত এবং জুরিরা সাধারণত পাবলিক নুইস্যান্সের দাবি খারিজ করে দেন, কারণ এতে প্রমাণের মানদণ্ড অনেক উঁচু। তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এই ধরনের মামলা হয়েছে, কিন্তু সেখানেও অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে।
এআই চ্যাটবট যে জনসাধারণের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে—এই দাবি প্রমাণ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এআই নির্মাতারা হয়তো বলবেন, যারা 'ক্ষতিগ্রস্ত' হচ্ছেন তারা আগে থেকেই মানসিকভাবে দুর্বল। ফলে এআইকে দায়ী করা ভুল হবে। তাদের যুক্তি, ব্যবহারকারীরা নিজেরাই এআই ব্যবহার করেন, এবং এআই যা বলে তা মানা বা না মানা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এছাড়া, অনেক সময় এআই ইতিবাচক পরামর্শ দিয়ে মানুষকে সাহায্যও করে। তাই একটি মামলায় প্রমাণ করতে হবে যে, এআই-এর ক্ষতিকর প্রভাব ব্যাপক ও পরিমাপযোগ্য। শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখিয়ে পাবলিক নুইস্যান্স প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
এই মামলায় জেতার জন্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে যে, এআই চ্যাটবটের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে বা সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। এ ধরনের বৈজ্ঞানিক ও পরিসংখ্যানগত প্রমাণই আদালতে কার্যকর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশু-কিশোরদের নিয়ে মামলা করা সহজ। কারণ, বিচারক ও জুরিরা শিশুদের মানসিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখেন এবং তাদের সুরক্ষায় বেশি আগ্রহী হন। নিউ মেক্সিকোর মামলাটিও মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কদের কেন্দ্র করেই হয়েছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, পাবলিক নুইস্যান্স আইনের 'ডাস্টবিন' বা 'গ্র্যাব ব্যাগ' হিসেবে পরিচিত। কারণ, নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকলে এই ধারাটি ব্যবহার করা হয়। তারা মনে করেন, এআই-এর ক্ষতিকর দিকগুলো মোকাবিলায় নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা উচিত। সেক্ষেত্রে পাবলিক নুইস্যান্সের মতো অস্পষ্ট আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তবে অপর একটি পক্ষ বলছে, নতুন আইন তৈরি হতে যত সময় লাগবে, ততদিন এআই-এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষ রক্ষা পাবে না। তাই বিদ্যমান আইনি কাঠামোতেই এআই নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের উক্তি উল্লেখ করে তারা বলছেন, 'বিলম্বিত ন্যায়বিচার ন্যায়বিচারহীনতারই নামান্তর।'




