সত্তরের দশকের মাঝামাঝি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর একটি গ্রামে বাবা-মায়ের হাত ধরে এসেছিল ফিলিপস রেডিও। দাম ছিল তখনকার হিসেবে সম্ভবত ২৫০ টাকা। গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে এমন যন্ত্র ছিল। ফলে আমাদের বাড়ির এই রেডিওটি হয়ে উঠেছিল পুরো পাড়ার সম্পদ। সন্ধ্যা নামলেই উঠানে পাটি পেতে বসতেন প্রতিবেশীরা। কেউ একজন রেডিও চালু করতেন, আর সবাই নিঃশব্দে মন দিতেন শোনায়। গান, খবর, ক্রিকেট-ফুটবলের ধারাভাষ্য, নাটক—সবই ছিল কল্পনার জানালা খুলে দেওয়ার মতো।
সেসময় রেডিওতে নিয়মিত অনুষ্ঠানের তালিকাও ছিল বেশ সমৃদ্ধ। দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে শুরু হতো ‘গীতালি’, উপস্থাপনায় হেনা কবির। বিকেলের দিকে সৈনিকদের জন্য ‘দুর্বার’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করতেন হাবিবুর রহমান জালাল। রাত ৯টায় ‘উত্তরণ’-এ শফি কামালের কণ্ঠ শোনা যেত। সকাল সাড়ে ৭টায় ‘দর্পণ’ প্রযোজনা করতেন দেলোয়ার হাসান। দুপুরে চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে ১৫ মিনিটের একটি অনুষ্ঠান হতো, যেখানে ছিলেন নাজমুল হোসেন। প্রতি শনিবার রাত ৯টায় ‘বিহঙ্গ’-এ শ্রোতাদের চিঠির জবাব দিতেন কাজী আরিফ ও প্রজ্ঞা লাবণী। এসবের পাশাপাশি আবদুল হামিদ, খোদা বক্স মৃধা, সরকার কবির উদ্দিন—এদের কণ্ঠে খেলার ধারাভাষ্য ও খবর শোনা ছিল অন্য রকম অভিজ্ঞতা। কণ্ঠগুলোর মধ্যে ছিল এক ধরনের মাধুর্য ও ব্যক্তিত্ব, যা যেকোনো শ্রোতাকে আন্দোলিত করত।
তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল জসীমউদ্দীনের নাটক ‘মধুমালা’ ও ‘বেদের মেয়ে’। বছরে এক-দুইবার এসব নাটক প্রচারিত হতো, আর প্রচারের প্রায় এক মাস আগে থেকে রেডিওতে ঘোষণা দেওয়া হতো। পূর্ণিমার কাছাকাছি রাত বেছে নেওয়া হতো, যেন খাঁটি জোছনায় সবাই ঘরে বসে শুনতে পারেন। নাটকের রাতে আমাদের ছোট্ট উঠান ভরে যেত পাড়ার মানুষে। মা উঠানে পাটি বিছিয়ে দিতেন। ছোট-বড় সবাই গোল হয়ে বসত। মনে হতো উঠানটাই যেন একটি মঞ্চ। নাটক শেষ হতে রাত সাড়ে ১১টা বেজে যেত।
মায়ের প্রিয় ছিল ‘উত্তরণ’-এর শুরুর অংশ ‘বিশ্ব বিচিত্রা’। তিনি এত মন দিয়ে শুনতেন যে মাঝেমধ্যে রেডিও বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়তেন। অন্য ঘর থেকে তখন শোনা যেত রেডিওর একটানা ঘর্ঘর শব্দ। আমাকে উঠে গিয়ে রেডিও বন্ধ করতে হতো।
এমনই এক রাতে সেই ঘর্ঘর শব্দ শুনে ঘুম ভাঙল আমার। দরজা খুলে উঠানে পা দিয়েই দেখি অন্ধকারে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই আমার চিৎকার—‘চোর! চোর!’ চিৎকার শুনে ওরা দৌড় দিল, আমিও ছুটলাম পিছু পিছু। পাড়ার লোকজন জেগে উঠে হইচই শুরু করল। অন্ধকারে প্রায় আধা কিলোমিটার ছুটে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হলো—আমার সঙ্গে তো কেউ নেই! ফিরে এসে দেখি, বাড়িতে আমাকে না পেয়ে মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
ঘটনার কয়েক দিন পর পাড়ার এক ছেলে জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে দেখতে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে দেখে সে বেশ বিচলিত হয়ে ওঠে। তখন কিছু বুঝতে পারিনি। পরে মা জানালেন—সেই রাতে আমি যাকে চোর ধরে তাড়া করেছিলাম, সে আসলে ওই ছেলেই। চুরি করতে এসে আমার চিৎকারে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, আর সেই ভয় থেকেই তার জ্বর এসেছিল। পরে ছেলেটি মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমাও চেয়েছিল।
রেডিওটি বহু আগেই হারিয়ে গেছে। কিন্তু এর ঘর্ঘর শব্দটি আজও কানে বাজে। শব্দটা মনে এলেই ভেসে ওঠে মায়ের মায়াময় মুখ, জোছনা রাত, পাড়ার মানুষদের ভিড় আর এক ভীতু ছেলের গল্প। লেখক জহুরুল হক বুলবুল, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল।




