ফুটবল বিশ্বে দলবদলের সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, তবে সময়ের সাথে সাথে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়। বার্সেলোনার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গ্রীষ্মকালীন দলবদলে মার্কাস রাশফোর্ডকে স্থায়ীভাবে না রেখে অ্যান্টনি গর্ডনকে বিপুল অর্থ দিয়ে দলে নেওয়াকে শুরুতে এক বড় জুয়া হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, যিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন তাকে ছেড়ে কেন নতুন কাউকে নিয়ে আসা হলো? কিন্তু চলতি মৌসুমের প্রথম ১০টি ম্যাচ পার হওয়ার পর গর্ডনের ভূমিকা বার্সার এই সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিগুলো সামনে আনতে শুরু করেছে।
গত মৌসুমে বার্সেলোনার দুটি শিরোপা জয়ের পথে রাশফোর্ড যথেষ্ট কার্যকর ছিলেন। ধারে খেলতে এসে ৪৯ ম্যাচে তিনি ১৪টি গোল করেন এবং ১৫টি গোল করান। ৮ কোটি ইউরোতে আসা এই ফরোয়ার্ডের গতি এবং গোল করার ক্ষমতা বার্সার আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এমনকি কোচ হান্সি ফ্লিকের খেলার ধরনের সাথেও তিনি মানিয়ে নিয়েছিলেন। মাত্র ৩ কোটি ইউরোতে তাকে স্থায়ী করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বার্সেলোনা ভিন্ন পথ বেছে নেয় এবং ৮ কোটি ইউরো খরচ করে নিউক্যাসলের সাবেক উইঙ্গার অ্যান্টনি গর্ডনকে দলে আনে।
এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ লুকিয়ে আছে কোচ হান্সি ফ্লিকের ফুটবল দর্শনে। ফ্লিকের মতে, একজন খেলোয়াড়কে শুধু বল পায়ে দক্ষ হলেই চলে না, বরং বল যখন তার পায়ে থাকে না, তখন তাকে সমান তীব্রতায় খেলতে হয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানো এবং জায়গা বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশফোর্ডের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষ করে জমাট রক্ষণ সামলানো এবং বল ছাড়া নড়াচড়ার ক্ষেত্রে তিনি ফ্লিকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারতেন না। গত মৌসুমে রাফিনিয়ার অনুপস্থিতিতে তিনি যখন খেলেছিলেন, তখন বল ছাড়া পরিশ্রমের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
ঠিক এই জায়গাতেই গর্ডন নিজেকে আলাদা প্রমাণ করেছেন। ২৫ বছর বয়সী এই ইংলিশ উইঙ্গার শুধু গতির জন্য নন, বরং ফ্লিকের ফুটবল দর্শনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার জন্য দলে এসেছেন। মৌসুমের প্রথম ১০টি ম্যাচের ৭টিতেই তিনি শুরুর একাদশে ছিলেন এবং ৯ ম্যাচে ২ গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন। তবে তার মূল অবদান পরিসংখ্যানের বাইরে। গর্ডন বল ছাড়াই দারুণ পরিশ্রম করেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের তাড়া করেন এবং রক্ষণভাগে সাহায্য করেন। তার এই দৌড় অনেক সময় সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবলের মূল ভিত্তি হলো দ্রুত বল ফিরে পাওয়া এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, যা গর্ডন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে করতে পারছেন।
এছাড়া বার্সেলোনার আক্রমণে ভারসাম্য আনতে গর্ডনের ভূমিকা অপরিসীম। ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল বল পায়ে জাদু দেখাতে ভালোবাসেন এবং আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। দুই প্রান্তের উইঙ্গারই যদি বল পায়ে থাকতে চায়, তবে আক্রমণে সমস্যা তৈরি হয়। গর্ডন এই সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। ইয়ামাল যখন প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টানেন, গর্ডন তখন বল ছাড়াই ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করেন এবং রক্ষণভাগের পেছনে দৌড় দেন। পেদ্রির মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডারদের জন্য গর্ডনের এই অবস্থান বল বাড়ানো সহজ করে দেয়।
রাশফোর্ডকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তার সামর্থ্য নিয়ে বার্সেলোনা সন্দিহান ছিল। বরং তারা এমন একজনকে চেয়েছিল যিনি বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় কার্যকর হবেন। যদিও ফুটবল অনিশ্চিত এবং আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত কাল ভুল হতে পারে, তবে আপাতত গর্ডনের পারফরম্যান্সে বার্সেলোনা তাদের প্রশ্নের উত্তর পেতে শুরু করেছে। এখন পুরো উত্তরটি লিখে দেওয়ার দায়িত্ব গর্ডনেরই।




