নব্বইয়ের দশকের আধুনিক গানের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী মনি কিশোর আর নেই। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার রামপুরার একটি বাসায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি প্রবল অনুরাগ ছিল তাঁর। নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপুরে ১৯৬১ সালের ৯ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মনি কিশোর একটি সংগীতপ্রেমী পরিবারে বড় হয়ে ওঠেন এবং আশির দশকের শেষভাগে ঢাকায় এসে সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। খুব অল্প সময়েই শ্রোতাদের মাঝে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি।
বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের মিক্সড অ্যালবামের স্বর্ণযুগে ‘কী ছিলে আমার’, ‘তুমি শুধু আমারই জন্য’ এবং ‘সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার’-এর মতো গানগুলো তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। প্রেম ও বিরহের আবেগী গান গেয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল শ্রোতাগোষ্ঠী। তাঁর দীর্ঘ সংগীত জীবনে পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। রেডিও ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও সিনেমা বা মঞ্চের চেয়ে অডিও অ্যালবামেই তিনি বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন।
তবে ২০০০ সালের পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে সংগীত অঙ্গন থেকে দূরে সরে যান। অভিমানী মন নিয়ে নীরবে কাটাতেন অনেকটা সময়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, পুনরায় গান করার পরিকল্পনা করছেন এবং পুরোনো গানগুলো পর্যায়ক্রমে ইউটিউবে আপলোড করছেন। বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতারা তাঁর গান শুনলেও মূল গায়কের পরিচয় সম্পর্কে উদাসীন, এই বিষয়টি তাঁকে ব্যথিত করত। তাই গান ও গানকারের সঠিক পরিচয় সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই চলে গেলেন তিনি।
মৃত্যুর ঘটনাটি সামনে আসে অত্যন্ত করুণভাবে। রামপুরার পপি ভবনের বাসিন্দা মনি কিশোরের ঘরের দরজা বেশ কিছুদিন ধরে ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রতিবেশীরা ভেবেছিলেন তিনি সম্ভবত বাইরে কোথাও গেছেন। তবে হঠাৎ করেই পপি ভবন ও সংলগ্ন ভবনের বাসিন্দারা তীব্র দুর্গন্ধ অনুভব করেন। সন্ধ্যার দিকে বাসার মালিক শামসুদ্দোহা তালুকদার সন্দেহ করেন মনি কিশোরের কোনো বিপদ হয়েছে। দরজার সামনে গিয়ে তীব্র গন্ধে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরপর তাঁর বন্ধু আদনান বাবু এবং পুলিশের সহায়তায় ঘরের দরজা খোলা হলে ভেতরেই মনি কিশোরের মরদেহ পাওয়া যায়।
তদন্ত ও তথ্যানুসারে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে তাঁর তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী শামীমা চৌধুরী এবং একমাত্র কন্যা নিন্তি চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এক সময়ের জনপ্রিয় এই গায়কের এভাবে নিঃসঙ্গ প্রয়াণে সংগীত অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।




