একটি মৃত গরুর রহস্যময় মৃত্যু এবং শরীরজুড়ে গভীর ক্ষত দিয়ে শুরু হয় দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর কোরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন হোপ হারবার শহরের গল্প। পুলিশ প্রধান বিওম-সকের (হোয়াং জং-মিন) নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই তদন্ত দ্রুতই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নেয়। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাশ, ভেঙে পড়ে দালানকোঠা এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তনাদ। অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয় পুরো শহর। পরিচালক না হং-জিনের এই ১৬০ মিনিটের সিনেমা ‘হোপ’ দর্শককে এমন এক অস্থির জগতে নিয়ে যায়, যেখানে বিপদের উৎস বোঝার আগেই তা আক্রমণ করে বসে।
সিনেমাটির প্রথম ভাগে দানবকে সরাসরি না দেখিয়ে ধ্বংসস্তূপ, মৃতদেহ এবং মানুষের আতঙ্কের মাধ্যমে তার উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা রহস্য ও উত্তেজনা বজায় রাখতে দারুণ কার্যকর। বিওম-সকের পেশাদারি নির্লিপ্ততা ভেঙে পড়ে যখন তিনি পরিচিত মানুষদের লাশ দেখতে থাকেন। অন্যদিকে, সুং-কি (জো ইন-সাং)-এর নেতৃত্বে একদল শিকারি বনে যায় রহস্যময় প্রাণীটিকে খুঁজতে। এই লড়াইয়ে বিওম-সকের সাথে যোগ দেন সাহসী নবীন পুলিশ কর্মকর্তা সুং-এ (জুং হে-ইওন)। তবে প্রাণীটির অসীম শক্তির সামনে তাদের অসহায়ত্ব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কারিগরি দিক থেকে সিনেমাটি বেশ সমৃদ্ধ। বিশেষ করে দ্রুতগতির গাড়ির ধাওয়া, বিস্ফোরণ এবং বন্দুকযুদ্ধের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত সাবলীল। চিত্রগ্রাহক হং কিয়ং-পিয়োর ক্যামেরার কাজ দৃশ্যগুলোর উত্তেজনা ও গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সিনেমাটি কেবল গম্ভীর থ্রিলার নয়; এতে ডার্ক হিউমার বা অদ্ভুত কৌতুকের ব্যবহার করা হয়েছে। বিপদের মাঝে চরিত্রদের হাস্যকর ভুল এবং উদ্ভট সিদ্ধান্তগুলো গল্পের এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে বিওম-সক চরিত্রে হোয়াং জং-মিন অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। একজন আত্মবিশ্বাসী পুলিশ অফিসারের থেকে ভয় ও হতাশায় ভেঙে পড়ার রূপান্তর তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া ‘স্কুইড গেম’ খ্যাত অভিনেত্রী জুং হে-ইওন সুং-এ চরিত্রে অ্যাকশন ও দৃঢ়তার মিশেলে বড় চমক দিয়েছেন। তবে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন বা মানসিক গভীরতার চেয়ে তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তোলাই ছিল নির্মাতার মূল লক্ষ্য।
সিনেমাটি কেবল এলিয়েন বা দানব শিকারের গল্প নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। উত্তর কোরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে বহিরাগতদের প্রতি জন্মগত সন্দেহ ও আগ্রাসন কাজ করে। এই মানসিকতা রহস্যময় প্রাণীর আগমনের পর আরও প্রকট হয়। পরিচালক এখানে প্রচলিত নায়কোচিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, বিপদের উৎস কেবল বাইরের প্রাণী নয়, বরং মানুষের ভেতরের লোভ, সংকীর্ণতা ও সহিংসতাও সমানভাবে ভয়ংকর হতে পারে।
তবে কিছু দুর্বলতাও লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে সিজিআই বা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের ক্ষেত্রে দানবের কিছু দৃশ্য বাস্তব লোকেশনের তুলনায় দুর্বল মনে হয়েছে। এছাড়া সিনেমার দীর্ঘ দৈর্ঘ্য এবং মাঝের অংশে গতির মন্থরতা উত্তেজনার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। শেষভাগে এলিয়েনদের পরিচয় সামনে এলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, যা সম্ভবত পরবর্তী কোনো পর্বের ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে, কিছু খামতি থাকলেও বিনোদনের দিক থেকে এটি বছরের অন্যতম সেরা কোরিয়ান সিনেমা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।




