জীবন অনেক সময় প্রত্যাশিত পথে চলে না, আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন জনপ্রিয় উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। ২০২২ সালে প্রথম তাঁর কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন, রোগটি চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রাথমিক ধাক্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ইমিউনোথেরাপি ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। তবে নিয়তি ছিল ভিন্ন; নিয়মিত ফলোআপ এবং জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে পুনরায় ক্যানসার ধরা পড়ে, তবে এবার তা ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যানসার।

বর্তমানে তিনি কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। চিকিৎসার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চুল পড়ে যাওয়া অনিবার্য ছিল। এই কঠিন সময়ে সামিয়াকে মানসিকভাবে শক্তি দিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাঁর পরিবার। প্রথমে সামিয়া তাঁর ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান। এরপর ছেলে এবং স্বামী এস এম রেজাউল ইমরান—উভয়েই স্বেচ্ছায় নিজেদের মাথার চুল ফেলে দেন, যেন সামিয়াকে এই কষ্ট একা বইতে না হয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সামিয়া বলেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই আসল কথা, তাই মন খারাপ না করে তিনি এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন।

সামিয়ার এই লড়াই সহজ ছিল না। প্রথমবার ক্যানসারের সময় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসায় তিনি তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন। ইমিউনোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিনি কথা বলা ও খাবার গিলতে সমস্যায় ভুগেছিলেন, এমনকি একসময় হুইলচেয়ারের সাহায্য নিতে হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামক এক প্রদর্শনীতে তিনি প্রথমবার প্রকাশ্যে নিজের অসুস্থতার কথা জানান। ১১ অক্টোবর প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাসই আসল। আল্লাহ তাঁকে সুস্থ রেখেছেন এবং তিনি চলাফেরা করতে পারছেন, এটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

পরিবারের সদস্যদের নিঃস্বার্থ সমর্থন তাঁর এই যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার। বড় ছেলে আহানাফ মায়ের পাশে থাকার জন্য কানাডায় পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এছাড়া ভাইয়ের ছেলের আইনি অভিভাবকত্ব নিয়েছেন সামিয়া। তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিমের চোখে জল থাকলেও তিনি মেয়ের মানসিক শক্তির উৎস। বাবা জানান, ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি সামিয়া এখন অন্য রোগীদের অনুপ্রেরণা হতে চান। তিনি ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামক পডকাস্ট এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্তদের সহায়তা ও সচেতনতা তৈরির কাজ করছেন। তিনি চান না অসুস্থতা যেন তাঁর একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। গান শোনা, বাগান করা এবং পোষা বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে তিনি জীবনের ছন্দ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে নিজেকে কিছুটা সময় দিতে থাইল্যান্ড সফরে গিয়েছেন তিনি, যেখান থেকে ফিরে আবার কেমোথেরাপির পরবর্তী কোর্সে অংশ নেবেন। তাঁর লক্ষ্য, নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্য রোগীদের মানসিক শক্তি জোগানো এবং ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় কমানোর জন্য কাজ করা।