শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষ তিথি মহানবমীতে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালী মণ্ডপে যথাযথ ধর্মীয় রীতি ও যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আরাধনা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এই মহাপূজায় অংশ নেন বিপুল সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী। পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশা দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেবী দুর্গতিনাশিনীর কাছে প্রার্থনা জানান ভক্তরা। তবে উৎসবের আনন্দ থাকলেও বিসর্জনের সময় ঘনিয়ে আসায় ভক্তদের মনে এখন বিদায়ের সুর।
মন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী জানান, কলিযুগে মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরের কোনো শক্তি নয়, বরং অন্তরের আসুরিক প্রবৃত্তি ও কু-রিপু। এই অশুভ শক্তি বিনাশ করে শুভ শক্তির জাগরণ ঘটাতে এই আরাধনা করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সত্যযুগে মানুষ ও অসুরের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে যুদ্ধ ছিল রাজ্য বা বংশগত বিরোধের কারণে; কিন্তু বর্তমান বিশ্বের হানাহানির মূলে রয়েছে মানুষের ভেতরের আসুরিক স্বভাব। তাই বিশ্বব্যাপী ভক্তরা মায়ের কাছে এই আসুরিক ভাব দূর করার প্রার্থনা করছেন।
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকালে শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহা স্নানের মাধ্যমে। এরপর ষোড়শ উপাচার ও বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার নবম রূপ মা সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করা হয়। ভক্তরা উপবাস থেকে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন এবং দুপুর ১২টার মধ্যে মূল আকর্ষণ মহা হোম বা যজ্ঞ সম্পন্ন হয়। পুরোহিতের মতে, যজ্ঞ ও হোমের মাধ্যমে পূজার মূল ধাপগুলো শেষ হয়েছে, এখন কেবল আরতি এবং আগামীকাল দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে বিজয়া দশমী পালন বাকি।
মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ ও বিষণ্ণতার সংমিশ্রণ দেখা গেছে। অনিল দেবনাথ নামের এক দর্শনার্থী জানান, নবমী মানেই উৎসবের শেষ মুহূর্ত, তাই একদিকে আনন্দ আর অন্যদিকে মন খারাপ। তিনি পৃথিবীর সব হিংসা ও হানাহানি বন্ধ হওয়ার প্রার্থনা করেন। এছাড়া সন্ধ্যার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে মন্দির প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে কাঁসা ও ঢাকের তালে ভক্তরা মেতে ওঠেন।
উৎসবের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় এবারের পূজা অত্যন্ত সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নবমীর সকালে বিহিত পূজা ও যজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে শেষ হওয়ার পর ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। আগামীকাল দুপুরে প্রতিমা নিয়ে ওয়াইজঘাটে রওনা হবে মন্দির কমিটি, সেখানে বিসর্জনের মাধ্যমে ছয় দিনের এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ষষ্ঠীর মাধ্যমে দুর্গাপূজার শুরু হয়েছিল। এবার সপ্তমীর তিথি দুই দিন ধরে থাকায় রবিবার ও সোমবার সপ্তমীর পূজা সম্পন্ন হয়। শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে এসেছেন এবং নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন। বুধবার বিজয়া দশমীর মাধ্যমে এই শারদীয় উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে।




