রাজধানীর ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে মহা অষ্টমীর শুভক্ষণে উদযাপিত হলো ঐতিহ্যবাহী কুমারীপূজা। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় মহা অষ্টমীর নিয়মমাফিক পূজার মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ঢাক-কাঁসরের শব্দ ও ভক্তদের উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিশেষ এই আয়োজন। এবারের কুমারীপূজায় দেবী দুর্গার প্রতিরূপ হিসেবে পূজিত হয়েছেন ছয় বছর বয়সী ইজ্জা চক্রবর্তী, যাঁর শাস্ত্রীয় নাম দেওয়া হয়েছে 'উমা'।
সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ইজ্জাকে পূজামঞ্চে বসানো হয় এবং পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পূজার সমাপ্তি ঘটে। এদিন কুমারী দেবীর দর্শন পেতে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকেই মঠে ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ পূজামঞ্চের সামনে ভিড় করেন এবং মুঠোফোনে ইজ্জার ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। পূজার পুরো সময়েই কুমারী দেবী ইজ্জাকে অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছিল; সে কখনো হাসছিল, আবার কখনো ঢাকের তালের সাথে হাতে থাকা পদ্মফুল নেড়ে খেলছিল, যা উপস্থিত ভক্তদের মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানের শেষে ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজ কুমারী দেবীর পরিচয় এবং এই বিশেষ পূজার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ইজ্জা চক্রবর্তী আইডিয়াল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শুদ্ধাত্মা কুমারী কন্যাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ সবচেয়ে বেশি ঘটে, তাই দুর্গাপূজার সময়ে তাঁদের দেবী হিসেবে পূজা করা হয়। এই পূজা দুর্গাপূজার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত।
ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজ বলেন, ১৯০১ সালে কলকাতার বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কুমারীপূজার সূচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি নয়জন কুমারীর পূজা করেছিলেন, যাদের মধ্যে ব্রাহ্মণ কন্যার পাশাপাশি অব্রাহ্মণ এবং অহিন্দু কন্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। হিন্দু ধর্মমতে, এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কন্যাদের কুমারী হিসেবে পূজা করার বিধান রয়েছে এবং বয়স অনুযায়ী তাঁদের শাস্ত্রীয় নাম ভিন্ন হয়। এই আচারের মূল লক্ষ্য হলো ঈশ্বরের আরাধনার পাশাপাশি নারী শক্তি ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং নারীর মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
পূজা দেখতে আসা রায়েরবাজারের বাসিন্দা অমিত রায় তাঁর স্ত্রী ও মেয়েসহ উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, কুমারীপূজা কেবল একটি ধর্মীয় প্রথা নয়, বরং এটি মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে নারীর শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং মানবতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মহা অষ্টমীর দিনে এই আয়োজন করা হয়, যা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুমারীপূজা শেষে মঠে সন্ধিপূজার আয়োজন করা হয় এবং দুপুরে বেলতলায় উপস্থিত ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।




