ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি, বংশ এবং ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাকে আইনি ভাষায় ‘মাকাসিদ আশ–শারিয়াহ’ বলা হয়। এই ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কোনো সাধারণ শাস্তি নয়, বরং এটি শুধুমাত্র সেইসব গুরুতর অপরাধের জন্য নির্ধারিত যা রাষ্ট্র ও সমাজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই দণ্ডের মূল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

ইসলামি আইনে প্রধানত চারটি ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আলোচিত হয়েছে। প্রথমত, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। একে ‘কিসাস’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৭৮ নম্বর আয়াতে এর বিধান দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে আইনি দর্শন হলো, একজন মানুষের জীবনের মূল্য অন্য সবার সমান। তবে এখানে ভুক্তভোগীর পরিবারের বিশেষ অধিকার রয়েছে; তারা চাইলে খুনিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে অথবা রক্তপণ (দিয়াত) গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারে, যা সমাজে ক্ষমার সংস্কৃতি উৎসাহিত করে।

দ্বিতীয়ত, বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া। ইসলামে পরিবারকে সমাজের মূল ভিত্তি ধরা হয়, তাই বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচারকে পারিবারিক কাঠামো ও বংশধারার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই শাস্তি কার্যকর করার শর্ত অত্যন্ত কঠিন। অপরাধটি প্রমাণের জন্য চারজন নির্ভরযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে সরাসরি অপরাধের চূড়ান্ত মুহূর্তটি দেখতে হবে। যেহেতু ইসলাম ব্যক্তিগত পাপ গোপন রাখার পক্ষপাতী, তাই কেবল প্রকাশ্য বিদ্রোহের স্তরে পৌঁছালে তবেই এই কঠোর দণ্ড প্রযোজ্য হয়।

তৃতীয়ত, সন্ত্রাসবাদ ও জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো, যাকে ফিকহশাস্ত্রে ‘হিরাবাহ’ বলা হয়। অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টি, ছিনতাই বা ডাকাতির সময় হত্যা করাকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হয়। সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই বিধানের মূল দর্শন হলো ‘মাসলাহা মুরসালাহ’ বা জনস্বার্থ রক্ষা করা। সশস্ত্র অপরাধীদের কঠোর দণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।

চতুর্থত, সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ধর্মত্যাগ। ইসলামি রাষ্ট্রের আনুগত্য অস্বীকার করে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা এবং মুসলিম সমাজের ঐক্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ধর্মত্যাগ করাকে ‘রিদ্দাহ’ ও ‘বাগি’ বলা হয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা এবং গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতা ঠেকানোর লক্ষ্যে এই কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে ইসলামি বিচারব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি অনুসরণ করা হয়। তা হলো, কোনো প্রমাণে সামান্যতম সন্দেহ বা অস্পষ্টতা থাকলে সর্বোচ্চ শাস্তি বা ‘হদ্দ’ মওকুফ করে দেওয়া হয়। বিচারক যদি শতভাগ নিশ্চিত না হন, তবে তিনি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে লঘু শাস্তি (তাজির) প্রদান করবেন। ইসলামি আইনের মূল লক্ষ্য হলো, কোনো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে আদালতের বড় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা।