জীবন যুদ্ধে অদম্য লড়াই করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন একদল মেধাবী শিক্ষার্থী। অভাব, অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক শোকের পাহাড় ডিঙিয়ে তারা এই সাফল্য পেলেও, উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ইটাউড়ি গ্রামের বাসিন্দা স্বপ্ন রায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তার জীবন ছিল অত্যন্ত করুণ; তিন বছর আগে লিভার সিরোসিসে বাবা অভিজিৎ রায় এবং তার আগে স্তন ক্যানসারে মা সন্ধ্যা রানী দাস মারা যান। চিকিৎসার খরচ মেটাতে পরিবারের সব সহায়-সম্পদ বিক্রি হয়ে যায়। এরপর কাকা অভিমুন্য রায়ের আশ্রয়ে এবং সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যান স্বপ্ন। তার স্বপ্ন একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা, যাতে টাকার অভাবে আর কারও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু না হয়। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার তাকে অত্যন্ত মেধাবী বলে অভিহিত করেছেন। তবে তার কাকা জানান, আর্থিক সংকটের কারণে একা তার উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো সম্ভব নয়।
নীলফামারী শহরের বস্তিতে ১০ বাই ১০ ফুটের টিনের ঘরে সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে বাস করেন মোছা. শাবনাজ খাতুন রানি। রিকশাচালক বাবা ইসমাইল ও অসুস্থ মায়ের সহায়তায় নানা প্রতিকূলতার মাঝেও আল ফারুক একাডেমি থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি। অনেক রাত না খেয়ে কাটাতে হয়েছে শাবনাজকে। শিক্ষকদের সহযোগিতায় অর্ধেক বেতনে পড়াশোনা করলেও এখন কলেজে পড়ার খরচ নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তার বাবা ইসমাইল জানান, বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে রিকশা চালিয়ে মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ মেটানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বাড়াগাঁও গ্রামের লিজা আক্তার এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। চার বছর বয়সেই তিনি মাকে হারান। দিনমজুর বাবার সংসারে চরম অভাবের মাঝেও পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। নবম শ্রেণি থেকে নিজের পড়াশোনার খরচ মেটাতে প্রতিদিন দুটি টিউশনি করেছেন লিজা। তার স্বপ্ন একজন শিক্ষক অথবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। তবে বাবার আর্থিক অনটনের কারণে কলেজের বই-খাতা ও পোশাক কেনার খরচ নিয়ে পরিবারটি চিন্তিত। দাউদকান্দি আদর্শ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন তার মেধার প্রশংসা করে আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মী রাণী পাল মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরির কারিগর তার বাবা পরিতোষ পালের মাসিক আয় খুবই সামান্য। চাষযোগ্য জমি না থাকায় এবং কাজ মন্দা থাকায় পরিবারটি চরম সংকটে থাকে। গাইড বই কেনার সামর্থ্য না থাকায় অন্যের খাতায় লেখা নকল করে পড়তে হয়েছে লক্ষ্মী রাণীর। তার লক্ষ্য আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে বিচারক হওয়া। তবে সীমিত আয়ে পরিবারের বাকি সদস্যদের খরচ সামলে কলেজে পড়ার খরচ চালানো এখন তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই চার শিক্ষার্থীর গল্পই প্রমাণ করে, মেধা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তাদের এই মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার পথ এখন অনিশ্চিত।




