চাকরিতে যোগদানের অপেক্ষায় রয়েছেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের ভয়রাপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম (২৭)। একাধিক বিসিএস পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ৪৫তম ও ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে এবং ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ৪৯তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা আগে হওয়ায় প্রথমে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পান, পরে ৪৬তম বিসিএসে নিজের পছন্দের প্রশাসন ক্যাডারে স্থান পান।
শৈশব ও কৈশোর ছিল অত্যন্ত প্রতিকূলতায় ভরা। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না, তাই সন্ধ্যা হলেই কুপি বা হারিকেনের আলোয় পড়তে হতো তাঁকে। মাঝে মাঝে বাবার কৃষিকাজে সহায়তা করতেন, আবার রাতে স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন। সংসারে আর্থিক অভাব ছিল তীব্র, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগও পাননি। তবুও থেমে থাকেননি।
নিয়ামতপুর সিনিয়র আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এসএসসি) ও আলিম (এইচএসসি) উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'খ' ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৩২০তম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ২০২তম স্থান পান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
নজরুলের বাবা জালাল উদ্দিন পেশায় কৃষক। সংসার চালাতে কৃষিকাজের পাশাপাশি ঝালমুড়ি বিক্রিও করেন। চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নজরুল দ্বিতীয়। বড় ভাই নাজমুল ইসলাম স্নাতকোত্তর পাস করেছেন, সেজো ভাই বরজু মিয়া রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ছোট ভাই তৌফিক মিয়া দশম শ্রেণি এবং বোন জান্নাতুন আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা চালানো ছিল কঠিন, তবুও বাবা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কিছুদিন রাতে ওষুধের দোকানে কাজ করেছেন নজরুল। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রাইভেট টিউশনিও করেছেন। মা-বাবার কষ্ট দূর করার জন্য একদিন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি। সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়েছে। নিজের সাফল্যের বিষয়ে নজরুল বলেন, 'মা-বাবা ও শিক্ষকদের দোয়ায় এবং আল্লাহর রহমতে আমি আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। আমি যেন সততা ও কর্মনিষ্ঠা বজায় রেখে দেশের সেবা করতে পারি এবং সুনামের সঙ্গে চাকরিজীবন কাটাতে পারি—সকলের কাছে সেই দোয়া চাই।'
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বাবা জালাল উদ্দিন বলেন, 'ছেলের মনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আমার জীবনের সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।' প্রায় এক দশক আগে ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রথম আলোয় নজরুলকে নিয়ে 'দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায়, তবু পড়া নিয়ে শঙ্কা!' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল। সেই শঙ্কা কাটিয়ে এবার নিজের কাঙ্ক্ষিত প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি, যা তাঁর সংগ্রামী জীবনযাত্রার সফল সমাপ্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।




