বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় সব শিশুর বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলেও শিক্ষার গুণগত মান এখনো একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক তথ্যানুসারে, ১০ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ বয়সোপযোগী সহজ লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে সক্ষম নয়। তুলনামূলকভাবে মালয়েশিয়ায় এই হার ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং দেশের প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে ৩০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বর্তমানে প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।
গত শুক্রবার বিশ্বব্যাংকের পর্ষদ সভায় এই ঋণ অনুমোদিত হয়, যা আজ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে এই অর্থায়ন করা হবে। ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ বছর, যার মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে থাকবে। মূলত 'লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড একসিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম' নামক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর শিখনফল উন্নত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিশুরা তাদের নির্দিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী গণিত, লেখা ও পড়ার প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এবং সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি আরও গতিপ্রাপ্ত হবে।
এই কর্মসূচির আওতায় বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রধান শিক্ষককে বিশেষ নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে এবং বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা থাকবে এবং এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া শিশুদের প্রাথমিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্যাকেজ চালু হবে, যার মধ্যে সুনির্দিষ্ট পাঠপরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, এই প্রকল্পের ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৮ লাখ ৪৩ হাজার নতুন ও উন্নত বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। গত বিশ বছরে সব শিশুর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করেছে, আর এখনকার লক্ষ্য হলো তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, যাতে ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হয়। অন্যদিকে, কর্মসূচির দলনেতা ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষা-বিশেষজ্ঞ তাসমিনা রহমান উল্লেখ করেন যে, কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের প্রথম ধাপ হলো পড়া ও গণনার মজবুত ভিত্তি। কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই এই কর্মসূচিতে অতিরিক্ত পাঠদানের বিশেষ পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, মাদ্রাসা এবং এনজিও পরিচালিত প্রতিষ্ঠাসহ মোট দুই কোটিরও বেশি শিশু প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনা করছে।




